Monday, 16 March, 2026

কম খরচে বেশি লাভ: পিরোজপুরের কৃষকদের ভাগ্য বদলাচ্ছে বরই চাষ


স্বল্প খরচ, অধিক মুনাফা ও বাজারে চাহিদা থাকায় ধান ও অন্যান্য ফসল ছেড়ে এখন বরই বা কুল চাষে ঝুঁকছেন পিরোজপুরের কৃষকরা। অল্প সেচ ও পরিচর্যায় একবার গাছ লাগালে কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়ায় বরই চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে জেলায়। এরই মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলের পথ দেখছেন স্থানীয় চাষিরা।

সরেজমিনে নাজিরপুর উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের বরই বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, গাছ ভরে গেছে সবুজ-হলুদ ও লালচে বরই। আকারে বড় ও স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় বাগান থেকেই পাইকাররা কিনে নিচ্ছেন উৎপাদিত বরই। জেলায় মূলত আপেল, বলসুন্দরী, থাই ও কাশ্মীরি জাতের বরই চাষ বেশি হচ্ছে। প্রতি গাছ থেকে গড়ে ৩০ কেজি বরই সংগ্রহ করতে পারেন চাষিরা। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে পিরোজপুরের বরই।

কম খরচে অধিক ফলন ও দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে বরই চাষে আগ্রহ বাড়ছে। একবার গাছ রোপণের পর কয়েক বছর ফলন পাওয়া যায়, যা নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা দেয়। অন্যদিকে ধান চাষে খরচ উঠলেও লাভের মুখ দেখা যায় না বলে জানান চাষিরা। একই জমিতে ধানের চেয়ে বরই চাষ করে কয়েকগুণ বেশি আয় সম্ভব হচ্ছে।

আরো পড়ুন
মামলা প্রত্যাহার শর্তে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ১২ লাখ কৃষকের কৃষিঋণ মুক্তির টাকা দেবে সরকার
কৃষকদের মামলা প্রত্যাহারের শর্তে ঋণখেলাপি পরিশোধ করবে সরকার

যেসব কৃষকের ঋণ মুক্তি করা হয়েছে, তাদের ব্যাংকে পাওনা টাকা ও সুদ পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এর শর্ত হিসেবে Read more

উত্তরাঞ্চলে অতি বর্ষণে তলিয়ে গেছে আলুক্ষেত, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ আলু চাষি

টানা বর্ষণে উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলার রবিশস্য, বিশেষ করে আলুক্ষেতগুলো প্লাবিত হয়ে গেছে। এরই মধ্যে বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় Read more

ধান চাষ ছেড়ে বরই চাষে ঝুঁকছেন কৃষক, বাড়ছে আয়

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পিরোজপুরের সাতটি উপজেলায় প্রায় ১৪৬ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হচ্ছে। এসব জমি থেকে প্রায় ১৩২১ মেট্রিক টন বরই উৎপাদন হচ্ছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা।

বরই চাষি বীরেন বিশ্বাস জানান, ‘বরই চাষ করে আমরা লাভবান হচ্ছি। এলাকার অধিকাংশ মানুষ এখন এ চাষের সঙ্গে জড়িত। বাজারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দামে বরই বিক্রি হয়। কখনো ৪ হাজার, কখনো সাড়ে ৩ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করি। প্রতি একর বরই চাষে খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা, আর আয় হয় বিঘাপ্রতি ২ লাখ টাকার বেশি।’

বীরেনের স্ত্রী বলেন, ‘বাগানে বরই তোলা, পরিচর্যা ও পাইকারদের কাছে বিক্রির কাজ করি। পিরোজপুর, ইন্দেরহাট, নাজিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাগানে এসে বরই কিনে নেন। নিয়মিত স্প্রে, সার ও আগাছা পরিষ্কার করতে হয় বাগানে।’

তারাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা নারায়ণ চন্দ্র জানান, ‘এ গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষ বরই চাষের সঙ্গে জড়িত। অনেকে লিচু ও আম চাষও করেন। প্রতি কেজি বরই ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা আরমান শেখ বলেন, ‘এলাকার মানুষ এখন বরই, আম ও লিচু চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্বরূপকাঠি, ইন্দেরহাট, পিরোজপুর, কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বরই কিনতে আসেন। ধানের চেয়ে বরই চাষ অনেক বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা এ দিকে ঝুঁকছেন।’

পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘জেলায় ১৪৬ হেক্টর জমিতে কুল চাষ হচ্ছে। নারিকেলি, বলসুন্দরী ও ভারতসুন্দরী—এই তিন জাতের বরই চাষ হয় এখানে। মোট উৎপাদন ১৩২১ মেট্রিক টন। বরই চাষিদের সব ধরনের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। রোগবালাই ও সার ব্যবস্থাপনায় মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিকল্পিত বরই চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের আর্থিক অবস্থার আরও উন্নতি হবে এবং দেশের ফল উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

0 comments on “কম খরচে বেশি লাভ: পিরোজপুরের কৃষকদের ভাগ্য বদলাচ্ছে বরই চাষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ