Saturday, 31 October, 2026

রংপুরে কমছে ৩,৪৮৪ হেক্টর আবাদি জমি, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা


বড় ব্যবসায়ীরা প্রণোদনা পেলেও কৃষকদের বেলাতেই বাধা: কৃষি উপদেষ্টা

কৃষিপ্রধান রংপুর অঞ্চলে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ। বাড়ি নির্মাণ, শিল্পকারখানা, ইটভাটা ও অন্যান্য স্থাপনা স্থাপনের ফলে আবাদি জমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা, ফলে খাদ্যের চাহিদাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রংপুরের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে এবং ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে রংপুর জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ৩ হাজার ৪৮৪ হেক্টর। অপরদিকে, একই সময়ে জেলার জনসংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৩ জন। বার্ষিক খাদ্যশস্যের চাহিদা বেড়েছে ২৭ হাজার ৫৯৪ টন, কিন্তু উদ্বৃত্ত খাদ্যের পরিমাণ মাত্র ২ হাজার ৭০৫ টন।

একসময় রংপুর অঞ্চলে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদিত হতো, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব ছিল। বর্তমানে এ অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও তা চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় নগণ্য। ডিএই কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে জেলার প্রায় ৩২ লাখ মানুষের খাদ্য চাহিদা স্থানীয় উৎপাদন থেকে মেটানো গেলেও ভবিষ্যতে আবাদি জমির এই সংকোচন অব্যাহত থাকলে এই সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরো পড়ুন
স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: কম খরচে লাভজনক আনারকলি (Passion Fruit) চাষ পদ্ধতি ও যত্ন
বাংলাদেশে আনারকলি চাষ

বাংলাদেশের কৃষিতে সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রচলিত ফল ও সবজি চাষে বিপ্লব ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক নাম হলো Read more

লেয়ার মুরগি পালনঃ লেয়ার মুরগির ফার্মে কখন কি টিকা দিতে হবে?
লেয়ার মুরগির ফার্মে কখন কি টিকা দিতে হবে?

লেয়ার মুরগির খামারে রোগের ঝুঁকি দূর করতে এবং সঠিক ডিম উৎপাদন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বয়স অনুযায়ী টিকা (Vaccine) দেওয়া আবশ্যক। Read more

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রংপুর জেলায় মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ ৩৩ হাজার ১২৯টি। এর মধ্যে ৯৫ হাজার ১৪০টি পরিবার ভূমিহীন এবং ২ লাখ ৪ হাজার ৪৯০টি পরিবার প্রান্তিক কৃষক।

জেলায় মোট এক ফসলি জমির পরিমাণ ৮ হাজার ৭৭৩ হেক্টর, দুই ফসলি জমি ৮৭ হাজার ৪৭২ হেক্টর, তিন ফসলি জমি ৯২ হাজার ৮৩২ হেক্টর এবং চার ফসলি জমি ৮ হাজার ৯৬০ হেক্টর। জেলার নীট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩৩ হেক্টর।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আবাসনের চাহিদা। ফলে আবাদি জমি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন বসতবাড়ি। এছাড়া কলকারখানা, ইটভাটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনাও গড়ে উঠছে উর্বর এ কৃষিজমিতে। এর ফলশ্রুতিতে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে কৃষিজমি।

রংপুরের শঠিবাড়ি এলাকার কলেজ শিক্ষক সুনীল কুমার রায় বলেন, ‘এখন থেকে ১৫-২০ বছর আগেও আমাদের এলাকায় বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ ছিল। এখন প্রায় সব জমিতেই একের পর এক গড়ে উঠেছে কারখানা।’

মিঠাপুকুর পৌর শহরের বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক আব্দুস সাত্তার জানান, ‘সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ছোটখাটো কারখানা ও বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য এলাকার বেশিরভাগ কৃষিজমি ব্যবহার করা হয়েছে।’

রংপুর জেলা গৃহায়ণ ও কৃষিজমি রক্ষা কমিটির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে শিল্প সম্প্রসারণের নামে উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস করা হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে রংপুর অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

কৃষি কর্মকর্তারা মনে করেন, ভূমি জোনিং আইন ও কৃষিজমি সংরক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফসলি জমি অরক্ষিত থাকছে এবং দখল ও রূপান্তরের ঘটনা বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলে খাদ্যশস্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে তারা আরও জানান, কৃষিজমি কিছুটা কমলেও আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ও স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল ফসলের কারণে এখন পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যায়নি।

রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকরা আধুনিক চাষাবাদে আরও দক্ষ হওয়ায় উৎপাদন এখনও উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে কোনো অবস্থাতেই যেন তিন ফসলি জমি কৃষির বাইরে অন্য কাজে ব্যবহার না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জমির উর্বরতা রক্ষায় সুষম সার ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই রংপুরের মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে কৃষিজমি সংরক্ষণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।’

0 comments on “রংপুরে কমছে ৩,৪৮৪ হেক্টর আবাদি জমি, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ