Thursday, 15 October, 2026

কাজু ও কফি: যেভাবে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি


পাহাড়ের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কাজু বাদাম ও কফি চাষ। একসময় আমদানিনির্ভর এই দুটি ফসল এখন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং কৃষকদের আগ্রহের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষ করে বান্দরবানে, এর চাষাবাদ দিন দিন বাড়ছে। এই পরিবর্তন শুধু পাহাড়ের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই আনছে না, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।

বাড়ছে চাহিদা, বাড়ছে উৎপাদন

বিশ্ববাজারে কাজু বাদামের চাহিদা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের, আর বাংলাদেশে এর বাজার ৭০০ কোটি টাকা। একইভাবে, দেশে বছরে ২ হাজার টন কফির চাহিদা রয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। একসময় এই চাহিদার ৯৫% আমদানি দিয়ে পূরণ হলেও এখন চিত্রটা ভিন্ন।

আরো পড়ুন
রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি টাকার সার কিনছে সরকার
রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি টাকার সার কিনছে সরকার

রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি ৪৭ লাখ ১৪ হাজার ৮৫০ টাকার পটাশিয়াম (এমওপি) ও ডিএপি সার কেনার Read more

কক্সবাজারে জনপ্রিয় হচ্ছে লবণসহিষ্ণু ধান চাষ
কক্সবাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে লবণসহিষ্ণু ধান চাষ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাটির লবণাক্ততা। ফলে স্বাভাবিক কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় Read more

পার্বত্য জেলার আবহাওয়া ও পরিবেশ কাজু ও কফি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বান্দরবানে ৮০০ হেক্টর জমিতে কাজু বাদাম চাষ হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার হেক্টরে। কফি চাষের জমিও ৪০০ হেক্টর থেকে বেড়ে ১ হাজার হেক্টরে উন্নীত হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্প এই অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া একটি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের উন্নত জাতের কাজু ও কফি চারা, সার ও বালাইনাশক সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে ৪২০০ হেক্টর জমিতে কাজু এবং ১৮০০ হেক্টর জমিতে কফির আবাদ হচ্ছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান

কাজু ও কফি চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন প্রায় ৫-৬ হাজার কৃষক। এই চাষের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠায় নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। বান্দরবানে প্রতিষ্ঠিত ‘কিষান ঘর’ এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে কাজু ও কফি প্রক্রিয়াজাত করছে, যা কৃষকদের ন্যায্য মূল্য পেতে সাহায্য করছে।

কিষান ঘরের স্বত্বাধিকারী মো. তারিকুল ইসলাম জানান, কৃষকদের মাঝে এখন যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা বজায় থাকলে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে দেশীয় চাহিদা দেশের উৎপাদন দিয়েই মেটানো সম্ভব হবে। তবে তিনি কৃষি ঋণের সহজলভ্যতার ওপর জোর দেন, কারণ এই খাতের উন্নয়নে এটি একটি বড় বাধা।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

এই সম্ভাবনাময় খাতের কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব এর মধ্যে অন্যতম। প্রায় ২ হাজার বাগান দেখাশোনার জন্য মাত্র ৬ জন মাঠ সংগঠক আছেন, যা যথেষ্ট নয়। এছাড়া, কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ৩০০ উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে, যা এই খাতের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তারা আশা করেন, সরকার এই খাতের দিকে আরও মনোযোগ দেবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। এটি কেবল পাহাড়ের অর্থনীতিকেই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

0 comments on “কাজু ও কফি: যেভাবে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ