Saturday, 11 July, 2026

মধ্যপ্রাচ্য সংকট: বিপন্ন হতে পারে বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা


ইরান–ইসরাইল–যুক্তরাষ্ট্র

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এই দেশগুলো সরাসরি শীর্ষ খাদ্য উৎপাদনকারী নয়, তবে জ্বালানি, সার সরবরাহ এবং উন্নত কৃষি প্রযুক্তির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করার ক্ষমতা রাখে।

১. উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনে বিপর্যয়

ইরান গম, যব, চাল ও পিস্তাচিও উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ সেচব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে, ইসরাইল বিশ্বজুড়ে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি এবং ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ বা বিন্দু সেচ পদ্ধতির জন্য পরিচিত। যুদ্ধাবস্থায় দেশটির কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি রপ্তানি ব্যাহত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আধুনিক কৃষি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরো পড়ুন
লাভজনক গলদা চিংড়ি চাষ: পোনা ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুত করার আধুনিক ও সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশী মৎস্য চাষিদের কাছে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা চিংড়ি চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। তবে গলদা চিংড়ি চাষে সফলতার প্রধান Read more

বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা: মোটা চাল কেটে সরু করার রমরমা বাণিজ্য
বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নাজিরশাইল, চাঁন্দিনাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী ধান বিলীন হয়ে গেছে। অথচ দেশের চালের বাজারে গেলে এখনো Read more

২. জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ

যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক খাদ্য রপ্তানির প্রধান শক্তি হলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্য তেলের প্রধান উৎস হওয়ায় সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষিতে:

  • ট্রাক্টর ও সেচ পাম্পের খরচ বাড়বে।

  • পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

  • সার কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ায় সারের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

৩. সার সংকট ও বাণিজ্যিক রুটের ঝুঁকি

ইরান প্রাকৃতিক গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ হওয়ায় নাইট্রোজেনভিত্তিক সার উৎপাদনে শক্তিশালী। যুদ্ধের ফলে সার উৎপাদন বা রপ্তানি কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের তীব্র সংকট দেখা দেবে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীলোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটগুলো ঝুঁকিতে পড়লে শস্য ও খাদ্যপণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এর ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার আমদানিনির্ভর দেশগুলো চরম খাদ্য সংকটে পড়বে।

৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রভাব

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্যমূল্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে গম ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে তা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী সংঘাত কেবল সামরিক সক্ষমতার লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক কৃষি অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের থালার অন্ন নিয়ে এক ভয়াবহ জুয়া। তাই বিশ্ববাসীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক সমাধান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।

0 comments on “মধ্যপ্রাচ্য সংকট: বিপন্ন হতে পারে বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ