
দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে এক অভূতপূর্ব সংকট দেখা দিয়েছে। আমদানি করা সুতার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশি স্পিনিং মিলগুলো। এই সংকট নিরসনে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের দাবি জানিয়েছে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। দাবি আদায় না হলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সংকটের মূলে অসম প্রতিযোগিতা
বিটিএমএ জানায়, প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের সুতা রপ্তানিতে বড় অংকের ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেয়। ফলে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধায় বাংলাদেশে আসা এসব সুতা প্রতি কেজিতে স্থানীয় সুতার চেয়ে প্রায় ৩০-৩৫ সেন্ট কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এই অসম দামের পার্থক্যের কারণে দেশি মিলগুলো আর প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বিপর্যয়ের চিত্র: বন্ধ ৫০টি মিল, বেকার ২ লাখ শ্রমিক
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ইতোমধ্যে ৫০টি স্পিনিং মিল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অন্তত ৫০টি মিল বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এর ফলে সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ২ লাখ শ্রমিক ও কর্মকর্তা।
বস্ত্র খাতের পেশাজীবী সংগঠনগুলোও আজ রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা জানায়, মিলগুলো বন্ধ হলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাবে, যা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বিটিএমএ বনাম বিজিএমইএ: শুল্ক নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত পক্ষগুলো
সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব নিয়ে দেশের প্রধান দুটি বাণিজ্যিক খাত এখন মুখোমুখি অবস্থানে:
বিটিএমএ-র দাবি: দেশি শিল্প বাঁচাতে ১০-৩০ কাউন্ট সুতার ওপর আমদানিশুল্ক বসানো জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এনবিআর-কে সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র আপত্তি: পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি, সুতার ওপর শুল্ক বসালে উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে পারে।
১ ফেব্রুয়ারির আলটিমেটাম
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার যদি দেশি শিল্প রক্ষায় কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ না নেয়, তবে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব টেক্সটাইল মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।”
অন্যদিকে, বিটিএমএর সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার প্রশ্ন তোলেন, ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও কেন এনবিআর তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। সরকারের ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে’ এই খাতটি পঙ্গু হতে চলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এক নজরে বস্ত্র খাতের বর্তমান সংকট:
| খাত | বর্তমান অবস্থা/দাবি |
| বন্ধ মিলের সংখ্যা | ৫০টি (আরও ৫০টি ঝুঁকির মুখে) |
| কর্মহীন শ্রমিক | প্রায় ২ লাখ |
| দামের পার্থক্য | আমদানি করা সুতা প্রতি কেজিতে ৩০-৩৫ সেন্ট সস্তা |
| বিটিএমএ-র সিদ্ধান্ত | ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ |
| মূল দাবি | ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ |
সহজ কথায়: বাংলাদেশের বস্ত্র খাত এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি সরকার এখনই আমদানিশুল্ক ও দেশি শিল্পের সুরক্ষায় সমন্বয় না করে, তবে পোশাক রপ্তানি খাতও দীর্ঘমেয়াদে কাঁচামাল সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

