Monday, 19 January, 2026

আলু চাষে ক্রমাগত লোকসান: পেশা বদলাচ্ছেন হতাশ কৃষক, ঝুঁকছেন তামাক চাষে


আলু চাষে ক্রমাগত লোকসান: পেশা বদলাচ্ছেন হতাশ কৃষক, ঝুঁকছেন তামাক চাষে

কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে মুন্সিগঞ্জের বিস্তীর্ণ মাঠে যখন আলু গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকার কথা, তখন ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মো. আবুল কালামের সময় কাটে রাজধানীর মিরপুরের যান্ত্রিক সড়কে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তিনি এখন ভ্যানে করে বেকারি পণ্য ফেরি করেন। ক্রমাগত লোকসানের মুখে নিজের শেষ সম্বল জমিটুকু রক্ষায় তিনি কৃষিকাজ অর্থাৎ আলু চাষ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

আবুল কালাম বলেন, ‘কয়েক দফা আলুতে শুধু লোকসান গুনেছি। সর্বশেষ দুই লাখ টাকা হারিয়ে জমি বাঁচাতে চাষবাস ছেড়ে দিয়েছি। ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তাতে অন্তত নিশ্চিত লোকসানের ঝুঁকি নেই।’

আবুল কালামের এই ব্যক্তিগত আখ্যান এখন দেশের হাজারো আলুচাষির সম্মিলিত হতাশার প্রতিচ্ছবি। গত মৌসুমে দেশে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে চলতি মৌসুমে সারা দেশে আলুর আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। দেনার দায়ে জর্জরিত অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন, কেউ আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন, আবার কেউবা ঝুঁকছেন ভিন্ন ফসলের দিকে।

আরো পড়ুন
বাংলাদেশকে ৩০ হাজার টন পটাশ সার উপহার রাশিয়ার
৩০ হাজার টন পটাশ সার উপহার রাশিয়ার

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে ৩০ হাজার টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার প্রদান করেছে রাশিয়া। Read more

ভেনামি চিংড়ির চাষের পোনা আমদানি স্থগিত, জোর দেওয়া হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির ওপর
ভেনামি চাষের পোনা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা

দেশে ভেনামি চিংড়ি চাষে পোনা আমদানির সব ধরনের নতুন ও বিদ্যমান অনুমোদন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার (১৫ Read more

উৎপাদন খরচের বোঝা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া বাবদ যুক্ত হয় আরও প্রায় ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ চলতি জানুয়ারির প্রথমার্ধে হিমাগার পর্যায়ে পাইকারি দর ছিল মাত্র ৫ থেকে ৮ টাকা। অর্থাৎ, আলু বিক্রি করে কৃষকের হিমাগারের ভাড়াই উঠছে না।

যদিও খুচরা বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে আলুর দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা, কিন্তু এর সুফল কৃষক পাচ্ছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে আলুর গড় বাজারমূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার কৃষক নাজির হোসেনের উদাহরণ এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। গত মৌসুমে দুই একর জমিতে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে তিনি যে আলু উৎপাদন করেছিলেন, বাজার পড়ে যাওয়ায় তা বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি তিনি দাম পেয়েছেন মাত্র ১ টাকা ২৭ পয়সা। ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি এবার নতুন করে আবাদের সাহস পাননি।

আবাদ হ্রাস ও ক্ষতিকর ফসলে ঝুঁকি

ধারাবাহিক লোকসানের ফলে স্বাভাবিকভাবেই আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাতেও।

রংপুরের তারাগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় নিশ্চিত বাজারের আশায় কৃষকরা আলুর পরিবর্তে ক্ষতিকর তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, আলুর দাম বাড়লে সরকার তদারকি করে, কিন্তু লোকসানের সময় কৃষকের পাশে কেউ দাঁড়ায় না। এছাড়া কুমিল্লাসহ অন্যান্য অঞ্চলে ঝুঁকি এড়াতে কৃষকরা অন্য সবজি চাষে মনোনিবেশ করছেন।

হিমাগারে অবিক্রীত মজুত ও বিশেষজ্ঞ মতামত

ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় অনেক কৃষক হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনই করেননি। জানুয়ারির শুরুতেও হিমাগারগুলোতে বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত ছিল। দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ কোটি টন হলেও সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে মোট উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়, যা জাতীয় সম্পদের বড় অপচয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান এই সংকটের মূলে পরিকল্পনাহীন উৎপাদন ও দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। সংকট উত্তরণে তিনি সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদিত আলুর অন্তত ১০ শতাংশ সরাসরি ক্রয়ের এবং আলু সংরক্ষণে হিমাগার ভাড়ার অর্ধেক ভর্তুকি হিসেবে প্রদানের সুপারিশ করেন। পাশাপাশি, তিনি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে কৃষকরা কৃষিপেশায় টিকে থাকার উৎসাহ পান।

0 comments on “আলু চাষে ক্রমাগত লোকসান: পেশা বদলাচ্ছেন হতাশ কৃষক, ঝুঁকছেন তামাক চাষে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ