
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমে বর্তমানে একটি নতুন শব্দ প্রচলিত হয়েছে— “সফট-শেল ক্র্যাব” বা নরম খোসার কাঁকড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে এর আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে এটিকে ‘সোনা’র সাথে তুলনা করা হচ্ছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কি সুন্দরবনের ফুসফুসকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
কাঁকড়া: সুন্দরবনের ‘ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার’
সুন্দরবনের মাটিতে কাঁকড়া কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি এই বনের স্থপতি। বনের সুস্থতায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম:
মাটির শ্বাস-প্রশ্বাস: ম্যানগ্রোভের মাটি অক্সিজেনহীন এবং বিষাক্ত সালফাইডযুক্ত। ‘ফডলার’ বা ‘সেসারমিড’ কাঁকড়ারা গর্ত খুঁড়ে মাটির গভীরে অক্সিজেন পৌঁছাতে সাহায্য করে, যা গাছের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখে।
পুষ্টির পুনঃচক্রায়ন: বনের ঝরা পাতা খেয়ে এরা মাটিকে উর্বর করে। এদের বর্জ্য নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের বড় উৎস।
বনের মালি: কাঁকড়া কোন প্রজাতির বীজ খাবে আর কোনটা খাবে না, তার ওপর নির্ভর করে বনের কোন এলাকায় কোন গাছ জন্মাবে।
বাজারের ‘সোনা’: অর্থনৈতিক উত্থান
২০২৪ সালে বাংলাদেশ কাঁকড়া রপ্তানি করে প্রায় ৭৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে গত অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৭৭%। হংকং, চীন, আমেরিকা এবং ইউরোপের বাজারে এই কাঁকড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
রপ্তানি বাজার ও গন্তব্য:
| গন্তব্য | পণ্যের ধরন | ব্যবহার |
| চীন ও হংকং | বড় জ্যান্ত কাঁকড়া | আভিজাত্যপূর্ণ ডাইনিং |
| ইউএসএ ও ইইউ | হিমায়িত নরম খোসা | স্যান্ডউইচ ও টেম্পুরা |
| জাপান ও কোরিয়া | প্রিমিয়াম সাইজ | চিলি ক্র্যাব ও উচ্চমানের সিফুড |
পর্দার আড়ালের বাস্তবতা: ‘ফ্যাটেনিং’ নাকি ধ্বংস?
যাকে আমরা কাঁকড়া চাষ বলছি, তা মূলত কোনো প্রথাগত চাষ নয়; বরং এটি ‘ফ্যাটেনিং’ বা গরু মোটাতাজাকরণের মতো একটি প্রক্রিয়া। সুন্দরবন থেকে অপরিপক্ক কাঁকড়া ধরে এনে প্লাস্টিকের বক্সে বা ঘেরে রাখা হয়।
বক্স কালচার: কাঁকড়া স্বভাবগতভাবে রাক্ষুসে (Cannibalism)। তাই এদের আলাদা বক্সে রাখা হয়।
সফট-শেল প্রক্রিয়া: কাঁকড়া যখন তার পুরনো খোলস ত্যাগ করে নতুন খোলস নেয়, তখনই তাকে সংগ্রহ করে হিমায়িত করা হয়। এই খোলসটি তখন কাগজের মতো পাতলা থাকে।
পরিবেশগত হুমকি: কেন এটি চিন্তার বিষয়?
১. হ্যাচারির অভাব: এখন পর্যন্ত শতভাগ কাঁকড়ার পোনা বা জুভেনাইল সংগ্রহ করা হয় সরাসরি সুন্দরবন থেকে। কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদনে সফল না হওয়ায় বনের ওপর চাপ বাড়ছে।
২. নিষিদ্ধ জাল ও বাইক্যাচ: একটি কাঁকড়া ধরতে গিয়ে জেলেরা অনেক সময় এমন জাল ব্যবহার করেন, যাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে (Bycatch) আরও ৩০-৪০টি জলজ প্রজাতি মারা পড়ে।
৩. অপরিপক্ক নিধন: উচ্চমূল্যের লোভে জেলেরা ছোট কাঁকড়া ধরে ফেলছেন, যা প্রজনন চক্রকে ব্যাহত করছে।
সোনা নাকি শঙ্খবিষ?
কাঁকড়া ছাড়া সুন্দরবনের মাটি বিষাক্ত হয়ে উঠবে এবং পুরো বন ধসে পড়তে পারে। আমরা কি কেবল কয়েক কোটি ডলারের জন্য সুন্দরবনের এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে ধ্বংস করে দিচ্ছি? অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে সাথে টেকসই বন ব্যবস্থাপনা এবং কৃত্রিম হ্যাচারি স্থাপন না করতে পারলে এই ‘সোনা’ অচিরেই সুন্দরবনের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।

