
বাংলাদেশে মাছ চাষের ক্ষেত্রে একুয়ামিমিক্রি (Aquamimicry) একটি অত্যন্ত আধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি, যা জলজ প্রাণীর প্রাকৃতিক বাসস্থানের পরিবেশ কৃত্রিমভাবে পুকুরে তৈরি করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সাধারণ চাষ পদ্ধতিতে যেখানে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে, সেখানে একুয়ামিমিক্রি প্রাকৃতিক উপায়ে পানির গুণমান নিয়ন্ত্রণ এবং মাছের খাদ্য যোগান নিশ্চিত করে।
বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় ১.৮ কোটি মানুষ মৎস্য খাতের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩.৫৭ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ চাষি এখনও সনাতনী পদ্ধতিতে চাষ করায় উৎপাদন খরচ বেশি, পানির মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অতিব্যবহারের কারণে রপ্তানিযোগ্য মাছের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। Aquamimicry এই সমস্যাগুলোর একটি কার্যকর সমাধান দিতে পারে। বিশেষত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা, যারা ঘেরে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ ও White Spot Syndrome Virus-এর কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্ষতির হার কমাতে এবং উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবেন।
একুয়ামিমিক্রি (Aquamimicry) কী?
সহজ কথায়, এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে কার্বন উৎস (যেমন: চালের কুঁড়া বা সয়াবিন মিল) এবং প্রোবায়োটিক (উপকারী ব্যাকটেরিয়া) ব্যবহার করে পানির ভেতর এক ধরণের প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরি করা হয়। এর ফলে পুকুরে প্রচুর পরিমাণে কোপিপোড (Copepods) এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক অনুজীব তৈরি হয়, যা মাছ বা চিংড়ির প্রধান খাদ্য হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশে একুয়ামিমিক্রির সম্ভাবনা
বাংলাদেশে মাছ চাষের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একুয়ামিমিক্রি একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে। এর মূল সম্ভাবনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
উৎপাদন খরচ হ্রাস: মাছের খাবারের (Feed) দাম দিন দিন বাড়ছে। এই পদ্ধতিতে পুকুরেই প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হওয়ায় বাইরের খাবারের ওপর নির্ভরতা এবং খরচ প্রায় ৩০-৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: বাংলাদেশের চিংড়ি চাষে একটি বড় সমস্যা হলো ভাইরাসের আক্রমণ। একুয়ামিমিক্রি পদ্ধতিতে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং ‘EMS’ বা ‘WSSV’ এর মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি কমে।
পরিবেশ সুরক্ষা: রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার না করায় পুকুরের মাটি ও পানি দীর্ঘ সময় ভালো থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই চাষ নিশ্চিত করে।
রপ্তানি সম্ভাবনা: আন্তর্জাতিক বাজারে এখন কেমিক্যাল-মুক্ত অর্গানিক মাছ ও চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা। একুয়ামিমিক্রি পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছ উচ্চমানের হওয়ায় ইউরোপ বা আমেরিকার বাজারে প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব।
চাষযোগ্য প্রজাতি: বাংলাদেশে বিশেষ করে গলদা ও বাগদা চিংড়ি, তেলাপিয়া এবং পাঙ্গাস চাষে এই পদ্ধতি দারুণ ফলদায়ক হতে পারে।
একটি জরুরি তথ্য: একুয়ামিমিক্রি (Aquamimicry) পদ্ধতিতে পানির রঙ সাধারণত হালকা বাদামী বা ‘চা’ এর রঙের মতো হয়, যা নির্দেশ করে যে সেখানে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় আছে।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
বাংলাদেশে এই পদ্ধতির প্রধান বাধা হলো প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব। তবে সরকারি মৎস্য অধিদপ্তর এবং অভিজ্ঞ চাষীদের সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই পদ্ধতি গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া গেলে বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি (Blue Economy) আরও সমৃদ্ধ হবে। এটি কেবল মাছের উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং একজন চাষীকে স্বাবলম্বী এবং পরিবেশ সচেতন হিসেবে গড়ে তুলবে।

