
ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাবনায় বাড়ছে সরিষার আবাদ। তবে কেবল তেলের চাহিদাই নয়, সরিষা ক্ষেত এখন হয়ে উঠেছে মধু আহরণের এক বিশাল খনি। পাবনা জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় ১২ হাজারের বেশি মৌবক্স স্থাপন করে প্রায় ১১০ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
আবাদি জমি কমলেও বাড়ছে উৎপাদন
জেলায় গত বছর সরিষার আবাদ হয়েছিল ৪৪ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৭০ হেক্টর। আবাদি জমি ক্রমেই কমে আসা সত্ত্বেও সরিষার ফলন এবং এর সাথে মধু চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ উত্তরোত্তর বাড়ছে।
মৌবক্স স্থাপনের পরিসংখ্যান (এক নজরে)
এ বছর জেলাজুড়ে মোট ১২,১৮৩টি মৌবক্স স্থাপন করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার বেশি।
| উপজেলা | মৌবক্সের সংখ্যা |
| ভাঙ্গুড়া | ৬,১২০টি |
| চাটমোহর | ৩,২৫০টি |
| সদর | ৭৮৮টি |
| ফরিদপুর | ১,০৭৫টি |
| ঈশ্বরদী | ৪৫০টি |
| অন্যান্য (বেড়া, সাঁথিয়া, আটঘরিয়া) | ৫০০টি |
সরিষা ও মধু: এক অটুট বন্ধন
মৌচাষিরা জানাচ্ছেন, প্রতিটি বক্সে প্রায় ১ লাখ কর্মী মৌমাছি ও একটি রানি মৌমাছি থাকে। সরিষা ফুল থেকে সংগৃহীত এই মধু কেবল চাষিদের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না, বরং সরিষার ফলন বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
পরাগায়ন: মৌমাছিরা এক ফুল থেকে অন্য ফুলে বসায় পরাগায়ন বৃদ্ধি পায়, যা সরিষার ফলন ২০-২৫% বাড়িয়ে দেয়।
খাঁটি মধুর নিশ্চয়তা: ভোক্তারা সরাসরি ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করতে পারছেন বলে বাজারে এই মধুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজি মধু গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষিদের অভিজ্ঞতায় সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ
ভাঙ্গুড়ার মৌচাষি সোহাগ ও রমজান জানান, প্রতি ৮ থেকে ১০ দিন পর পর একটি বক্স থেকে ২৫-৩০ কেজি মধু পাওয়া যায়। তবে মাঝের তীব্র শীতে মৌমাছিরা বক্স থেকে বের না হওয়ায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। চাটমোহরের চাষি হানিফ বলেন, “শুরুতে সরিষা চাষিরা মৌবক্স বসাতে দিতে না চাইলেও এখন তারা বোঝেন যে এতে তাদেরই লাভ। তাই এখন তারা নিজেরাই আগ্রহী হন।”
কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. রাফিউল ইসলাম জানান, জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার ৩০ কেজি মধু আহরণ সম্পন্ন হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই সংগ্রহ চলবে। কৃষি বিভাগ চাষিদের কারিগরি পরামর্শ ও মৌবক্স দিয়ে নিয়মিত সহযোগিতা করছে।
পাবনার এই ‘সরিষা-মধু’ মডেলটি দেশের অন্যান্য জেলার জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। এটি একদিকে যেমন ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে মধুর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

