
চেনা বাজার, চেনা দোকানদার—তবুও যেন সবকিছুই অচেনা। পবিত্র রমজান মাস সংযমের বার্তা নিয়ে এলেও রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইফতার ও সাহরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই এখন আকাশচুম্বী। বাড়তি দামের চাপে সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকেছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, কৃষি মার্কেট, মহাখালী কাঁচাবাজার ও জোয়ারসাহারা বাজারসহ বেশ কিছু বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পণ্যের দাম গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
অজুহাতের অন্ত নেই, দায় কার?
বাজারে দামের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পাইকারদের, আর পাইকাররা দায় চাপাচ্ছেন আমদানিকারকদের ওপর। কেউ বলছেন নির্বাচন-পরবর্তী সরবরাহ সংকট, আবার কেউ দেখাচ্ছেন পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাত। তবে সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, এটি মূলত অতি মুনাফালোভী একটি ‘সিন্ডিকেট’ চক্রের কাজ, যারা রমজান এলেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেট কাটছে।
আকাশছোঁয়া সবজি ও ইফতার সামগ্রী
রমজানে চাহিদা বাড়ার সুযোগে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে লেবু ও বেগুনের দাম।
লেবু: গত সপ্তাহে যে লেবুর হালি ছিল স্বাভাবিক, তা এখন মানভেদে ৮০ থেকে ১৫০ টাকা, এমনকি কোথাও ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেগুন ও শসা: প্রতি কেজি বেগুন ১০০ থেকে ১৪০ টাকা এবং শসা ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচা মরিচ: প্রতি কেজির দাম ঠেকেছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায়।
পেঁয়াজের বাজারেও অস্বস্তি কাটেনি। পাইকারিতে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোলার দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে এখন ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা। এছাড়া মসুর ডাল মানভেদে ১০০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাংস ও মুরগির বাজারে অস্থিরতা
চাহিদার অজুহাতে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দামও চড়া।
সোনালি মুরগি: ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা (কেজি)।
ব্রয়লার মুরগি: ২০০ থেকে ২১০ টাকা (কেজি)।
গরু ও খাসি: গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১,৩০০ টাকায় স্থিতু রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
শুল্ক ছাড়েও কমেনি খেজুরের দাম
সবচেয়ে বিস্ময়কর চিত্র দেখা গেছে খেজুরের বাজারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। উল্টো গত দুই সপ্তাহে কেজিতে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি আজওয়া ৮০০ থেকে ১,৪০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির মেডজুল ১,৪০০ থেকে ১,৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, পাইকারির তুলনায় খুচরা বিক্রেতারাই দাম বেশি বাড়াচ্ছেন।
ফলের বাজারেও আগুন
দেশি ফলের মধ্যে কলার দাম ডজনপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। পেয়ারা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং মাঝারি আনারস প্রতিটি ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানিকৃত বিদেশি ফলের দাম আগে থেকেই চড়া ছিল, যা এখন আরও বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত: পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও রমজানে এই মূল্যবৃদ্ধি অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

