
চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অর্থনীতি কয়েক যুগ ধরে আম কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ এবং বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব—সব মিলিয়ে আম চাষে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিকল্প ও লাভজনক ফসল হিসেবে এখন জেলার শত শত কৃষকের কাছে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে বরই চাষ।
বৈচিত্র্যময় জাত ও স্বল্প খরচে অধিক লাভ
জেলায় এখন আর শুধু দেশি বরই নয়, বরং চাষ হচ্ছে উন্নত মানের নানা জাতের বরই। এর মধ্যে চায়না, বল সুন্দরী, বোম্বাই ফুলী, ডায়মন্ড, বাউকুল, থাই, বেবি সুন্দরী ও ভারত সুন্দরী উল্লেখযোগ্য। কৃষকদের মতে, আমের তুলনায় বরই চাষে পরিচর্যা ও খরচ কম, কিন্তু ফলন পাওয়া যায় দ্রুত। অনেক চাষি এখন তাঁদের আম বাগানের ফাঁকা জায়গায় কিংবা দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পতিত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বরই চাষ শুরু করেছেন।
বিপণনের বড় কেন্দ্র ‘মির্জাপুর হাট’
বরই কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর এলাকা। প্রতিদিন দুপুর গড়াতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্যান ও পিকআপে করে ক্যারেটভর্তি বরই নিয়ে এই হাটে জড়ো হন কৃষকরা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের তথ্যমতে, এখান থেকে প্রতিদিন ট্রাকবোঝাই বরই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ বরই ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন
শিবগঞ্জের বরই চাষি তারেক রহমান নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “জন্মলগ্ন থেকে আমাদের পরিবার আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে আমে বারবার লোকসান দিয়ে আমরা আর্থিক সংকটে পড়ে যাই। বাধ্য হয়ে অল্প জমিতে বরই চাষ শুরু করি। খরচ কম ও ভালো দাম পাওয়ায় এখন আমি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছি।”
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫৬০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, “মির্জাপুর হাটে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকার বরই লেনদেন হচ্ছে। আম চাষে লোকসান কাটিয়ে উঠতে বরই চাষ কৃষকদের জন্য একটি বড় বিকল্প আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক চাষপদ্ধতি ও উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এটি জেলার কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আম নির্ভর অর্থনীতির বাইরে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই নতুন কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উন্নত হিমাগার ব্যবস্থা এবং বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

