Tuesday, 16 August, 2022

সর্বাধিক পঠিত

পাবদা মাছের আধুনিক চাষ পদ্ধতি


পাবদা মাছ চাষ পদ্ধতি

পাবদা মাছের আধুনিক ও লাভজনক চাষ পদ্ধতিতে যে বিষয়ে অধিক গুরত্ব দেয়া উচিৎ, পাবদা মাছ যেহেতু আইশ বিহীন নিশাচর মাছ সেহেতু পুকুরে রাতে খাবার দেয়া এবং পুকুরে এক কোনায় বাঁশ বেধে কচুরিপানা দেয়া উচিৎ।পাবদা মাছের পুকুরের তলা সমান থাকা উচিৎ।

আইশ বিহীন পাবদা মাছে কাটা কম থাকায় বাংলার আবহমান কাল থেকে ছোট বড় সবাই খেতে খুব পছন্দ করে।পাবদা মাছের পুষ্টিগুন ও ভাল। রয়েছে ভাল বাজার মূল্য।

কৃত্রিম ভাবে পোনা উৎপাদনের ফলে পাবদা মাছের পোনা সহজে পাওয়া যায়। পাবদা মাছের একক চাষ করে ও লাভবান হওয়া যায়।

রুই, কাতলা ও অন্য কার্প মাছের সাথে পাবদা মাছের মিশ্র চাষ করা ও যায়। পাবদা মাছের মিশ্র চাষের থেকে একক চাষে অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়।

পাবদা মাছের জন্য পুকুর নির্বাচনঃ

রোদ পড়ে এমন যায়গাতে পুকুর হওয়া ভাল। প্লাবন এলাকাতে পুকুরের পাড় উচু হওয়া উচিৎ। পাড়ে ঝোপ জঙ্গল ও গর্ত থাকা পাবদা মাছ চাষের জন্য ক্ষতিকর যা পরিস্কার ও সমান করতে হবে।
পাড়ে ইউক্যালেপ্টাস ও অন্য বড় গাছ থাকলে গাছের ডাল পালা ছাটায় করতে হবে। কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা রোদের আলো পড়া পুকুরে জন্য ভাল।

আইশ বিহীন পাবদা মাছের জন্য পুকুর প্রস্তুতিঃ

পুকুর প্রস্তুতির জন্য নিমোক্ত কাজ পর্যায়ক্রমে করতে হবে।

  • নার্সারি পুকুরে আয়তন ১০ থকে ৫০ শতক এবং পানির গভিরতা ৪ থেকে ৫ ফিট হলে ভাল।
  • পুকুর হতে অবঞ্ছিত ও রাক্ষুসে মাছ এবং আগাছা দুর করতে হবে।
  • পুকুরে শুকিয়ে অবঞ্ছিত ও রাক্ষুসে মাছ এবং আগাছা দুর করা উত্তম। তবে পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে প্রতি শতাংশে ১ ফুট পানির জন্য ২৫-৩০ গ্রাম রোটেনন পাউডার অথবা ফোসটক্সিন ট্যাবলেট দিয়ে রাক্ষুসে মাছ দুর করা যায়।
  • রোটেনন দেবার ৩-৪ দিন পর পুকুরে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
  • চুন প্রয়োগের ৩/৪ দিন পর প্রতি শতাংশে ৫-৭ কেজি গোবর, ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৭৫ গ্রাম টিএস পি প্রয়োগ করতে হবে।
  • নার্সারি পুকুরে ৩-৪ ফিট উচু মশারি জালের বেষ্টনি দিতে হবে যাতে সাপ ও ব্যাঙ পুকুরের ভিতরে ঢুকে রেনু ও পোনার ক্ষতি সাধন করতে না পারে।
  • হাস পোকা দমনের জন্য রেনু পোনা মজুদের ২৪ ঘন্টা পূর্বে সুমিথিয়ন দিতে। সুমিথিয়নের ব্যবহারের পরিমান প্যাকের গায়ে লেখা অনুসরণ করা ভাল।
  • পানির রং স্থির রাখতে প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম ব্রাইট গোল্ড (দানাদার) প্রয়োগ করা যেতে পারে।
  • সার প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর রেনু অথবা ২-৩ ইঞ্ছি সাইজের পোনা মজুদ করা যেতে পারে।
  • পুকুরের তলায় যদি গ্যাস থাকে তাহলে গ্যাস উত্তোলন করার জন্য “গ্যাস টপ” ঔষধ দিতে হবে ।

পাবদা মাছের নার্সারি ব্যবস্থাপনাঃ

সঠিক উপায়ে নার্সারি পুকুর প্রস্তুতির পর প্রতে শতাংশে ১০০ গ্রাম রেনু বা ডিম অথবা ৬০০০-৮০০০ পিস ৮ দিনের পোনা মজুদ করা যায়। পাবদা মাছের রেণু কে প্রথম তিন দিন সিদ্ধ ডিমের কুসুম খাওয়াতে হবে।

১ কেজি রেণুর জন্য প্রতিদিন সকলে ৮টি বিকাল বা রাতে ৮ টি ডিমের কুসুম খাওয়াতে হবে। সিদ্ধ ডিমের কুসুম গামছা দিয়ে ছেকে পরিষ্কার পানির সাথে ভাল করে মিশিয়ে সমস্ত পুকুরের সমান ভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে।

তিন দিন পরে প্যাকেট জাতীয় পাউডার ফিস ফিড দিতে হবে যেমন রেণু গোন্ড, টাইগার ব্রান্ড বা যেকোন নার্সারী ফিড। পাউডার ফিস ফিড পানির সাথে মিশিয়ে ভাল করে পুকুরের সমান ভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে।

তবে নার্সারী ফিড এর সাথে সরিষার খৈল ভিজিয়ে মাছকে খাওয়ানো যাবে। প্রথম সপ্তাহে মাছের ওজনের সমপরিমান খাবার দিতে হবে। অর্থাৎ ১ কেজি রেণু জন্য প্রতিদিন ১ কেজি খাবার দিতে হবে।

পাবদা মাছের রেণু প্রতিদিন ২ বার এবং রাতে ১ বার খাবার দিতে হবে। মাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে মাছের খাবার আস্তে আস্তে বাড়িয়ে বডি ওজনের অনুসারে দিতে হবে।

রেনু নার্সিং পুকুরে রোগ ব্যাবস্থাপনা:

ভাইরাস হল পাবদা মাছের রেণুর সবচেয়ে বড় সমস্যা। ভাইরাস একবার আক্রমন করলে পাবদা মাছকে আর বাঁচানো যায় না।

প্রতিরোধ হিসাবে আগে থেকেই প্রতি শতাংশে ২ গ্রাম হারে টিমসেন বা ভাইরেক্স প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া রোগ প্রতিরোগ ব্যবস্থা হিসাবে প্রতি সপ্তাহে লবণ ২০০ গ্রাম , পটাশ ২.৫ গ্রাম, পরিমাণ মত ভিটামিন সি প্রয়োগ করতে হবে।

পুকুরে যদি অক্সিজেনের অভাব হয় তাহলে অক্সিজেনের ট্যাবলেট অক্সি টেপ বা অক্সি গোল্ড অথবা অক্সিমোর প্রয়োগ করতে হবে।

পুকুরের তলায় অতিরিক্ত এ্যামোনিয়া গ্যাস হলে আস্তে আস্তে হয়রা টানতে হবে অথবা গ্যাস উত্তোলনের জন্য গ্যাসোনেক্স প্রয়োগ করতে হবে।

পাবদা মাছের চাষের পুকুর প্রস্তুতি :

চাষের পুকুর প্রস্তুতি এবং নার্সিং পুকুর প্রস্তুতি প্রায় একই রকম। পাবদা মাছের চাষের পুকুরে গোবর না দিলেও চলবে। পাবদা মাছের পুকুরের তলা সমান হওয়া উচিৎ।

পুকুরের যেকোন একপাশে কচুরিপানা বাঁশ দিয়ে বেধে দিলে পাবদা মাছের জন্য ভাল।

কি পরিমান পোনা পাবদা মাছের পুকুরে  মজুদ করবেন ?

চাষের পুকুরে পাবদা মাছ একক চাষের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টি পোনা মজুদ করা যাবে। পাবদা মাছ চাষে পুকুরে মিশ্র চাষ হিসাবে ৪ – ৫ ইঞ্চি সাইজের প্রতি শতাংশে ৮ থেকে ১০ পিচ রুই , কাতল, গ্রাসর্কাপ , মৃগেল মাছের পোনা ছাড়তে হবে ।

মিশ্র জাতীয় মাছের পোনা ছাড়লে পুকুরের পরিবেশ ভাল থাকে । পরিবহনের আগে এন্টিফাঈাস মেডিসিন দিয়ে গোসল করয়ে নিলে পাবদা মাছের পোনা ভাল থাকে এবং রোগ বালাই হয় না।

পাবদা মাছ এবং শিং মাছ এসাথে চাষ করা যায়। তেলাপিয়া মাছের সাথেও পাবদা মাছ চাষ করা যায়। পাবদা মাছের সাথে শিং মাছের সম্বন্বিত চাষ পদ্ধতি জানতে আমাদের শিং মাছের লাভজনক চাষ পদ্ধতি লেখা টি পড়লে আশা করি উপকৃত হবেন।

পাবদা মাছের চাষ পদ্ধতি

লাভজনক পাবদা মাছের পুকুরে খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ

মাছের খাদ্যের ক্রয়ে একজন মাছ চাষির ৭০ ভাগ বিনিয়োগ হয়ে থাকে। বাজারে রেডিমেট ফিড যেখানে ৩২-৩৮ % প্রোটিন আছে সেগুলো পাবদা মাছের ফিড হিসাবে ব্যবহার করা যায়।

এ ছাড়া ৩০% ফিস মিল, ৩০% সরিষার খৈল, ৩০% অটোকুড়া, ১০% ভূষি ও ভিটামিন প্রিমিক্স সহকারে সম্পূরক খাবার তৈরি করা যায়।

প্রথমে উল্লেখ করেছি পাবদা মাছ নিশাচর তাই সাধারণত রাতে খেতে পছন্দ করে। হাতে বানানো হোক আর রেডিমেট হোক খাবার রাতে ২ বার প্রয়োগ করা যেতে পারে। মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে অন্যান্য মাছের জন্য স্বাভাবিক নিয়মে খাবার দিতে হবে।

দৈনিক দেহ ওজনের ১২ ভাগ খাবার পোনা মজুদের পরের দিন থেকে মাছকে দিয়ে যেতে হবে। প্রতি ১৫ দিন অন্তর খাদ্য প্রয়োগের হার ১% করে কমাতে হবে।

দেহের ওজন ৩০ গ্রামের উর্ধ্বে উঠলে খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ হবে শতকরা ৫ ভাগ।

পাবদা মাছের রোগ:

মাছের পেট ফোলা রোগ:

পুকুরের তলদেশে অতিরিক্ত জৈব পদার্থ জমা হয়ে গেলে, মাছের মজুদ ঘনত্ব বেশি হলে, পানির পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় এবং পানিতে এ্যামোনিয়া এবং হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস উৎপন্ন হয় এবং এই রোগ দেখা দেয়।

পাবদা মাছের পেট ফোলা রোগের লক্ষণ:

মাছের পেট ফুলে যায়, ফোলা অংশে চাপ দিলে পায়ু দিয়ে পানি জাতীয় তরল বের হয়, চাপ দিলে ফোলা অংশের ভিতর গ্যাস বা তরল কিছু অনুভূত হয়। এই রোগে মাছের মৃত্যু ঘটে থাকে।

পেট ফোলা রোগের প্রতিকার:

প্রতি কেজি খাবারের সাথে ৫ গ্রাম অক্সিটেট্রাসাইক্লিন (বাজারে টেট্রাভেট নামে পাওয়া যায়), ১ গ্রাম ভিটামিন সি ও ২ গ্রাম লেসিফস মিশিয়ে ৩ থেকে ৫ দিন খাওয়াতে হবে।

খুব বেশি আক্রান্ত হলে ৫ গ্রাম অক্সিটেট্রাসাইক্লিন প্রতি শতাংশে হারে পুকুরে পানিতে মিশে দেয়া যায়।

পাবদা মাছের ক্ষত রোগের লক্ষন:

পাবদা মাছের ক্ষত রোগ হলে মাছের গায়ে লাল দাগের ক্ষত দেখা যায়। ক্ষত স্থানে চাপ দিলে পুজ বের হতে দেখা যায় অথবা বের হয়।

মাছের ক্ষত রোগের প্রতিকারঃ

  • মাছ রোগাক্রান্ত হলে পুকুর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ফেলতে হবে।
  • রোগাক্রান্ত মাছ কে ১০ লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম লবণ গুলে লবণমিশ্রিত পানিতে পাঁচ থেকে দশ মিনিট ডুবিয়ে রেখে অত:পর পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে।
  • ক্ষত রোগে আক্রমণের আগেই প্রতি বছর আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে পুকুরে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন ও ১ কেজি হারে লবণ প্রয়োগ করা হলে সাধারণত আসন্ন শীত মৌসুমে ক্ষত রোগের কবল থেকে মাছ মুক্ত থাকে।
  • ক্ষতরোগ নিরাময়ের জন্য ৭-৮ ফুট গভীরতায় প্রতি শতাংশ জলাশয়ে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন ও ১ কেজি হারে লবণ প্রয়োগ করা হলে আক্রান্ত মাছ দুই সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্য লাভ করে।

আহরন ও বিক্রয়ঃ

পাবদা মাছ ৬ থেকে ৭ মাসের মধ্যে ১৮ থকে ২০ টায় কেজি হয় এবং বিক্রয় উপযোগী হয়। তবে বিক্রয়ের জন্য বাজার যাছাই করে দাম পেলে বিক্রি করা উচিৎ।

লাভজনক পাবদা মাছ চাষ

আয় ও ব্যায়ঃ

মাছ চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিসাব রাখার জন্য হিসাব বই রাখা দরকার। এবং প্রতি ক্ষেত্রে ব্যায় লিখে রেখে হিসাব করা দরকার। আয় ও ব্যায় হিসাব করে মাছ চাষ করলে বাহুল্য বায় কম হয়।  

পাবদা মাছ নিয়ে আরো জানতে অনলাইনে ভিজিট করতে পারেন ।

One comment on “পাবদা মাছের আধুনিক চাষ পদ্ধতি

জালাল মিয়া

পাবদা মাছের রেনু কোথায় পাওয়া যায়?

Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!