বাংলাদেশী মৎস্য চাষিদের কাছে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা চিংড়ি চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। তবে গলদা চিংড়ি চাষে সফলতার প্রধান শর্ত হলো পোনা ছাড়ার আগে পুকুরটিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শতভাগ প্রস্তুত করা। সঠিক নিয়মে পুকুর প্রস্তুত না করে পোনা ছাড়লে পোনার মৃত্যুর হার বেড়ে যায় এবং চাষিকে চরম লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
গলদা চিংড়ির সুস্থ-সবল বৃদ্ধি এবং সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে পোনা ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুতকরণের ধাপগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পুকুর শুকানো ও তলদেশের কাদা অপসারণ
পুকুর প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হলো পুকুরের পানি পুরোপুরি সেচে ফেলে তলদেশ ভালোভাবে শুকানো।
পুকুরের তলা এমনভাবে শুকাতে হবে যেন মাটিতে ফাটল ধরে। এতে মাটির নিচে থাকা ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়ে যায়।
পুকুরের তলদেশে অতিরিক্ত কাদা থাকলে তা তুলে ফেলতে হবে। কারণ কাদা চিংড়ির জন্য ক্ষতিকর হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি করে।
২. পাড় মেরামত ও জলজ আগাছা পরিষ্কার
পুকুরের পাড় ভাঙা থাকলে তা ভালোভাবে মেরামত করতে হবে, যাতে বর্ষায় বাইরের নোনা বা নোংরা পানি ঢুকতে না পারে।
পুকুরের ভেতরে থাকা সব ধরনের জলজ আগাছা (যেমন— কচুরিপানা, শ্যাওলা) পরিষ্কার করতে হবে। এগুলো চিংড়ির চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
৩. রাক্ষুসে ও অচাষযোগ্য মাছ দূরীকরণ
পুকুরে যদি রাক্ষুসে মাছ (যেমন— শোল, বোয়াল, চিতল) বা অচাষযোগ্য ছোট মাছ থাকে, তবে তা চিংড়ির পোনা খেয়ে ফেলবে। এগুলো দূর করার দুটি উপায় রয়েছে:
পুকুর সম্পূর্ণ শুকিয়ে এই মাছগুলো ধরে ফেলা।
পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে প্রতি শতাংশে ফুটখানেক পানির জন্য ব্লিচিং পাউডার বা রোটেনন পাউডার ব্যবহার করে রাক্ষুসে মাছ মেরে ফেলতে হবে।
৪. চুন প্রয়োগ (মাটি ও পানির গুণগত মান উন্নয়ন)
চিংড়ি চাষে চুন প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মাটির অম্লত্ব (pH) নিয়ন্ত্রণ করে, রোগজীবাণু ধ্বংস করে এবং পানি পরিষ্কার রাখে।
পুকুর শুকানোর পর তলদেশে প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি হারে চুন (ডলোমাইট বা পোড়া চুন) গুঁড়ো করে ছিটিয়ে দিতে হবে।
চুন প্রয়োগের পর মাটির সাথে হালকা চাষ দিয়ে দিলে তা ভালো কাজ করে।
৫. সার প্রয়োগ ও প্রাকৃতিক খাদ্য (প্লাঙ্কটন) তৈরি
চুন প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর পুকুরে পানি প্রবেশ করাতে হবে। চিংড়ির প্রাথমিক খাবার হিসেবে পানিতে পর্যাপ্ত ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটন (প্রাকৃতিক খাদ্য) তৈরি করতে সার প্রয়োগ করতে হবে।
জৈব সার: প্রতি শতাংশে ৪-৫ কেজি পচানো গোবর বা কম্পোস্ট সার।
রাসায়নিক সার: প্রতি শতাংশে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৫০ গ্রাম টিএসপি (TSP) সার।
সার দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে পানির রং হালকা সবুজ বা বাদামি সবুজ হলে বুঝতে হবে পুকুরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়েছে।
৬. আশ্রয়স্থল বা ‘হাইডআউট’ তৈরি (গলদা চিংড়ির জন্য বিশেষ ধাপ)
গলদা চিংড়ির একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো এরা খোলস পরিবর্তনের সময় অত্যন্ত দুর্বল থাকে এবং একটি চিংড়ি অন্য চিংড়িকে আক্রমণ করে (Cannibalism)। তাই তাদের লুকানোর জন্য পুকুরে পর্যাপ্ত আশ্রয়স্থল তৈরি করতে হবে।
পুকুরের তলদেশে কিছু দূর পর পর বাঁশের ডালপালা, নারকেলের পাতা, বা পিভিসি (PVC) পাইপের টুকরো টুকরো অংশ ডুবিয়ে দিতে হবে।
এক নজরে পুকুর প্রস্তুতির সময়সূচী ও উপাদান:
| ক্রমি নম্বর | কাজের ধাপ | প্রয়োজনীয় উপাদান ও পরিমাণ (প্রতি শতাংশে) |
| ১ | মাটি শোধন ও চুন প্রয়োগ | ১ – ১.৫ কেজি চুন বা ডলোমাইট। |
| ২ | প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন | ৪-৫ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম টিএসপি। |
| ৩ | পানির উপযুক্ত গভীরতা | ৩ থেকে ৫ ফুট (আদর্শ পরিমাপ)। |
| ৪ | চিংড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা | বাঁশের পাতা, নারকেলের ডাল বা প্লাস্টিক পাইপ। |
পোনা ছাড়ার আগের চূড়ান্ত সতর্কতা
পুকুরে পানি দেওয়ার পর এবং পোনা ছাড়ার ঠিক ২-৩ দিন আগে পানির পিএইচ (pH) পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। গলদা চিংড়ির জন্য পানির আদর্শ pH হলো ৭.৫ থেকে ৮.৫। পানির তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তা পোনা ছাড়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়।
সঠিক নিয়মে তৈরি করা পুকুরে সুস্থ পোনা মজুত করলে চিংড়ির রোগবালাই কম হয় এবং অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা চাষিকে নিশ্চিত লাভের মুখ দেখায়।

