
প্রোটিন সমৃদ্ধ মটরশুঁটি বা ডালজাতীয় খাদ্যশস্য বর্তমানে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও লাভজনক ফসল। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও মটরশুঁটি (Yellow Beans/Yellow Peas)-এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্বল্প সময়ে কম খরচে বেশি লাভজনক হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সঠিক জাত নির্বাচন, জমি তৈরি ও আধুনিক বালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে এক বিঘা জমিতে মটরশুঁটি চাষ করেই স্বল্প সময়ে আকর্ষণীয় মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। লাভজনকভাবে মটরশুঁটি চাষের জন্য চাষিদের করণীয় ও প্রধান দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. উপযুক্ত মাটি ও জলবায়ু নির্বাচন
মাটি: সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি মটরশুঁটি চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটিতে পানি জমে থাকলে গাছের গোড়া পচে যেতে পারে, তাই পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা থাকতে হবে। মাটির পিএইচ (pH) ৬.০ থেকে ৭.০ এর মধ্যে থাকা উত্তম।
জলবায়ু: এটি প্রধানত ঠান্ডা ও আংশিক আর্দ্র জলবায়ুর ফসল। মটরশুঁটি চাষের জন্য ১০ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সবচেয়ে অনুকূল।
২. জমি প্রস্তুতকরণ ও বীজ বপনের সময়
জমি তৈরি: মটরশুঁটির গাছ চারা অবস্থায় বেশ নরম থাকে, তাই জমি ভালোভাবে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে আগাছামুক্ত ও মাটি ঝুরঝুরে করে সমতল করতে হবে।
বপনের সঠিক সময়: বাংলাদেশে মটরশুঁটি বপনের উপযুক্ত সময় হলো কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ (অক্টোবর থেকে নভেম্বর)।
বীজের পরিমাণ ও দূরত্ব: শতক প্রতি ২৫০-৩০০ গ্রাম (বা হেক্টর প্রতি প্রায় ৬০-৭০ কেজি) বীজের প্রয়োজন হয়। সারিবদ্ধভাবে বীজ রোপণের ক্ষেত্রে এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব ৩০-৪০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১৫-২০ সেন্টিমিটার রাখা উচিত।
৩. বীজ শোধন (Seed Treatment)
মাটি ও বীজবাহিত ছত্রাক থেকে চারা রক্ষা করতে বীজ বপনের আগে ভালো ছত্রাকনাশক (যেমন: কার্বেন্ডাজিম বা প্রোপিকোনাজল) দিয়ে বীজ শোধন করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে বীজের গজানোর হার বৃদ্ধি পায় এবং চারা সুস্থ থাকে।
৪. সুষম সার ব্যবস্থাপনা
মটরশুঁটি ডালজাতীয় ফসল হওয়ায় এটি বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে ধরে রাখতে পারে। তবে প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য সঠিক মাত্রায় সার দেওয়া প্রয়োজন:
জৈব সার: জমি তৈরির শেষ চাষের সময় শতক প্রতি ৪০ কেজি পচা গোবর বা কম্পোস্ট মেশাতে হবে।
রাসায়নিক সার: শতক প্রতি ২০০-৩০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০-৬০০ গ্রাম টিএসপি এবং ২৫০-৩০০ গ্রাম এমওপি (পটাশ) সার ব্যবহার করা যায়। সব সার জমি তৈরির শেষ চাষেই মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া ভালো।
৫. সেচ ও আগাছা দমন
সেচ: জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে বীজ বপনের পরপরই হালকা সেচ দিতে হবে। এছাড়া গাছে ফুল আসার সময় এবং শুঁটি পুষ্ট হওয়ার সময়ে হালকা সেচ দেওয়া দরকার। তবে কোনোভাবেই পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
আগাছা নিড়ানি: বীজ গজানোর ২০–২৫ দিনের মধ্যে প্রথমবার নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে মাটি আলগা করে দিতে হবে।
৬. রোগবালাই ও পোকা ব্যবস্থাপনা
জাব পোকা ও কাটুই পোকা: চারা অবস্থায় কাটুই পোকা ও পরবর্তী সময়ে জাব পোকার আক্রমণ হতে পারে। জাব পোকা দমনে অনুমোদিত ইমিডাক্লোরোপ্রিড বা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করা যেতে পারে।
পাউডারি মিলডিউ ও মরিচা রোগ: পাতার ওপর সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ (পাউডারি মিলডিউ) বা লালচে দাগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম বা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক নির্ধারিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।
এক নজরে মটরশুঁটি চাষের অর্থনৈতিক হিসাব:
| সূচক | বিবরণ |
| বপনের সময় | অক্টোবর থেকে নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ) |
| ফসল তোলার সময় | বপনের ৭০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে |
| শতক প্রতি গড় ফলন | ১২ থেকে ১৫ কেজি (সবুজ শুঁটি) |
| বাজার সম্ভাবনা | স্থানীয় বাজারে কাঁচা সবজি ও বিশ্ববাজারে শুকনা ডাল হিসেবে উচ্চ চাহিদা |
৭. ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
মটরশুঁটি যখন পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করে এবং গাঢ় সবুজ থেকে হালকা হলুদ হতে শুরু করে (ডাল বা শুকনা দানার জন্য), তখন ফসল সংগ্রহ করতে হবে। কাঁচা সবজি হিসেবে ব্যবহারের জন্য শুঁটি নরম ও সবুজ থাকতেই সংগ্রহ করা ভালো। বীজ সংরক্ষণের জন্য সংগৃহীত দানা ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে আর্দ্রতা কমিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখতে হবে।

