Tuesday, 18 August, 2026

বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা: মোটা চাল কেটে সরু করার রমরমা বাণিজ্য


বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নাজিরশাইল, চাঁন্দিনাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী ধান বিলীন হয়ে গেছে। অথচ দেশের চালের বাজারে গেলে এখনো দেদারসে মিলছে ‘মিনিকেট’ ও ‘নাজিরশাইল’ নামের চকচকে চাল। বাস্তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা গবেষকদের তালিকায় মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে কোনো ধানের জাতের অস্তিত্বই নেই।

প্রকৃতপক্ষে, আধুনিক অটোরাইস মিলের ডিজিটাল মেশিনে কমদামী মোটা জাতের হাইব্রিড ধান কিংবা ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধান কেটে, ছেঁটে ও পলিশ করে এই নামী-দামী ব্র্যান্ডের চাল বানানো হচ্ছে। এক শ্রেণির চালকল মালিক ভোক্তাদের পকেট কেটে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মুনাফা লুটে নিতে দীর্ঘদিন ধরে এই রমরমা প্রতারণা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

ডিজিটাল সেন্সর ও পলিশিং মেশিনে যেভাবে বদলে যায় চালের রূপ

আরো পড়ুন
দেশের অব্যবহৃত জলাশয় সংস্কার করে তরুণদের মধ্যে বন্টন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দেশের মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক ও কর্মসংস্থানমুখী করতে সরকারি জলমহাল, অব্যবহৃত পুকুর, হাওর-বাঁওড় ও জলাশয় সংস্কার করে স্থানীয় বেকার Read more

জনবল সংকট ও জরাজীর্ণ অবস্থা: মৌলভীবাজার সরকারি মৎস্য বীজ খামারে ধস

মৌলভীবাজার জেলার মৎস্যচাষীদের উন্নত ও গুণগত মানের মাছের পোনা সরবরাহের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত সরকারি ‘মৌলভীবাজার মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার’ চরম জনবল Read more

বগুড়ার সান্তাহার, দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর শহরের তিন শতাধিক অটোমেটিক রাইস মিলে মোটা চালকে কৃত্রিমভাবে চিকন ও চকচকে করার প্রক্রিয়াটি চলে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে। মিলগুলোর ভেতরে থাকা প্রযুক্তি যেভাবে কাজ করে:

  1. বাছাইকরণ: অটোরাইস মিলের ‘ডিজিটাল সেন্সর প্ল্যান্ট’-এর মধ্য দিয়ে যেকোনো ধান বা চাল পার করার সময় প্রথমে কালো চাল, ময়লা ও পাথর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে ফেলা হয়।

  2. রং পরিবর্তন: এরপর মোটা ধান চলে যায় অটোমিলের বয়লার ইউনিটে। সেখানে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ধাপ পার হওয়ার পর চালের ওপরের পুষ্টিকর লাল বা ধূসর আবরণ সম্পূর্ণ উঠে যায় এবং তা ধবধবে সাদা রং ধারণ করে।

  3. ছাঁটাই ও পলিশিং: সবশেষে চালগুলো পাঠানো হয় অতি সূক্ষ্ম ‘পলিশিং ও স্টিম’ মেশিনে। এই মেশিনের মাধ্যমে মোটা চালের চারপাশ কেটে কেটে চিকন বা সরু আকারে নিয়ে আসা হয় এবং স্টিম দিয়ে তা চকচকে ও শক্ত করা হয়। এভাবেই সাধারণ মোটা চাল রাতারাতি কথিত আকর্ষণীয় ‘মিনিকেট’ বা ‘নাজিরশাইল’ চালে রূপান্তরিত হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারে প্রাপ্ত মিনিকেট চালের বেশির ভাগই আসলে ব্রি-২৮ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রি-২৯ ধান কেটে তৈরি। একইভাবে, ব্রি-২৯ ধানকে অতিরিক্ত ছাঁটাই ও পলিশ করে বাজারে ‘নাজিরশাইল’ নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

মাঠের চিত্র: ১৮৫ জাতের ধান চাষ হলেও বাজারে মাত্র ২-৩টি!

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই জেলায় বিভিন্ন মৌসুমে প্রায় ১৮৫ প্রজাতির ধান আবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে:

  • আউশ মৌসুম: ২৮ প্রজাতির ধান।

  • রোপা আমন মৌসুম: উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ৫২ প্রজাতি, হাইব্রিড ২০ প্রজাতি এবং স্থানীয় জাতের ৭ প্রজাতি।

  • বোরো মৌসুম: উফশী ৪২ প্রজাতি ও হাইব্রিড ৩৬ প্রজাতি।

বর্তমানে বগুড়া অঞ্চলে উৎপাদিত ধানের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের। অথচ ধান থেকে যখন চাল করা হয়, তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ প্রজাতির ধান একত্রে মিক্সড করে চাল করা হচ্ছে। ফলে মাঠজুড়ে শত শত জাতের ধান থাকলেও বাজারে গেলে ব্রি-২৮ ও পাইজাম ছাড়া অন্য কোনো আসল ধানের চালের দেখা মেলা দুষ্কর।

বিলুপ্তির তালিকায় ঐতিহ্যবাহী ৩০ জাতের ধান

স্বাধীনতার পর থেকে সঠিক সংরক্ষণ ও আধুনিক উফশী জাতের দাপটে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী দেশি ধান পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়া জাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

নাজিরশাইল, বেগুন বিচি, গড়ে, কাতান, দুলাভোগ, ঘাসি কলসী, মালা, চাঁন্দিনা, খাটো বাদার, পোড়া খমন, বনসার, খলসি, কালমনা, হাসকল, জটা, কাশেবান্দা এবং বকুরি।

এক নজরে চাল ছাঁটাই বাণিজ্যের নেপথ্য চিত্র:

প্রধান কেন্দ্রসমূহছাঁটাইয়ের আসল উৎসকথিত বাজার নামলক্ষ্যবস্তু ও বাজার
সান্তাহার, দুপচাঁচিয়া, শেরপুর (বগুড়া)।ব্রি-২৮ / ব্রি-২৯ এবং বিভিন্ন মোটা হাইব্রিড জাত।মিনিকেট, নাজিরশাইল, কাটারিভোগকরপোরেট কোম্পানি, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহর।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সাদুবাড়ী এলাকার চাল ব্যবসায়ী ও সান এন্টারপ্রাইজের মালিক গোলাম রব্বানী জানান, অটোরাইস মিলগুলোতে মোটা চাল ছেঁটে বা পলিশ করে চিকন করার পর বিভিন্ন নামী-দামী করপোরেট কোম্পানি সেগুলো কিনে নেয়। পরবর্তীতে তারা নিজেদের সুন্দর মোড়ক বা ব্র্যান্ডের নামে ঢাকা ও বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে চড়া দামে বিক্রি করে।

খাদ্য বিভাগের বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে বগুড়া সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন-উর-রশিদ জানান, বিভিন্ন মোটা জাতের ধানের চালকে মিলাররা পলিশিং মেশিনের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন ও সুন্দর করে তোলেন। এছাড়া চালের ওপরের প্রাকৃতিক লাল আবরণ মেশিনের মাধ্যমে ঘষে পরিষ্কার করা হয়। চালকল মালিকরা মূলত অটোরাইস মিলে চাল তৈরি করে নিজস্ব ব্র্যান্ডের নাম দিয়ে বাজারে সরবরাহ করছেন, যার ফলে বাজারে বৈচিত্র্যময় ব্র্যান্ডের চাল দেখা গেলেও ভেতরে তা মূলত একই চাল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাল অতিরিক্ত পলিশ বা ছাঁটাই করার ফলে চালের মূল পুষ্টিগুণ ও ভিটামিন ‘বি’ (Thiamine) পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ভোক্তাদের শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে বাঁচাতে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে চালের বস্তায় ধানের আসল জাতের নাম লেখা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

0 comments on “বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা: মোটা চাল কেটে সরু করার রমরমা বাণিজ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ