Sunday, 12 July, 2026

সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট ও চড়া দাম


সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট ও চড়া দাম

আসন্ন বোরো ধান ও ভুট্টা ঘরে তোলার অপেক্ষায় দিন গুনছেন কুড়িগ্রামের কৃষক মামুনুর রশীদ। বর্তমান ফসলে সারের প্রয়োজন না থাকলেও আগামী মৌসুমের জন্য মরিচ, বেগুন ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে নতুন ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সারের জোগান নিয়ে চিন্তিত এই কৃষক।

মামুনুর রশীদ জানান, ইউরিয়া ও এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বিপত্তি বেঁধেছে ফসফেট জাতীয় সার নিয়ে। বাজারে ডিএপি (ডি-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) ও টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং দামও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি

আরো পড়ুন
লাভজনক গলদা চিংড়ি চাষ: পোনা ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুত করার আধুনিক ও সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশী মৎস্য চাষিদের কাছে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা চিংড়ি চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। তবে গলদা চিংড়ি চাষে সফলতার প্রধান Read more

বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা: মোটা চাল কেটে সরু করার রমরমা বাণিজ্য
বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নাজিরশাইল, চাঁন্দিনাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী ধান বিলীন হয়ে গেছে। অথচ দেশের চালের বাজারে গেলে এখনো Read more

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাবে বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সার সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামী জুন মাস পর্যন্ত ইউরিয়া এবং অক্টোবর পর্যন্ত নন-ইউরিয়া সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র: সিন্ডিকেট ও বাড়তি দাম

সরেজমিনে দেশের অন্তত ১০টি জেলায় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সারের বাড়তি দাম রাখছেন। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার কৃষক জহুরুল হক জানান, অনুমোদিত ডিলাররা প্রয়োজনীয় টিএসপি ও ডিএপি সরবরাহ করতে না পারায় তিনি খুচরা দোকান থেকে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হয়েছেন।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক মোক্তার আলী জানান, ১,০৫০ টাকা মূল্যের এক বস্তা ডিএপি সার বর্তমানে ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুলনার বটিয়াঘাটার কৃষক মো. ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, সার কিনতে গেলে বিক্রেতারা রসিদ দিচ্ছেন না এবং জোরপূর্বক কীটনাশক কিনতে বাধ্য করছেন। অন্যথায় সার বিক্রি করতে অস্বীকার করছেন তারা।

সরকারি ও বাজারমূল্যের ব্যবধান

বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন) নির্ধারিত প্রতি কেজি সারের খুচরা মূল্য নিচে দেওয়া হলো:

  • টিএসপি: ২৭ টাকা (বিক্রয় হচ্ছে ৩৫-৩৭ টাকায়)

  • ডিএপি: ২১ টাকা (বিক্রয় হচ্ছে ৩০-৩২ টাকায়)

  • এমওপি: ২০ টাকা

 কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলা কর্মকর্তারা জানান, সার সংকট মূলত একটি কৃত্রিম সংকট। কিছু অসাধু ডিলার বেশি মুনাফার আশায় সার মজুত করে রেখেছেন। রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, তামাক চাষের আধিক্যের কারণে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, “দেশে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের কোনো ঘাটতি নেই। মাঠপর্যায়ে দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা সমাধানের জন্য মাঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দোষী ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

0 comments on “সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট ও চড়া দাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ