
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে পোষা প্রাণী (Pet) বলতে মূলত গ্রামীণ পরিবেশে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল কিংবা পাহারা দেওয়ার জন্য কুকুর রাখাকে বোঝাত। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশেষ করে নগর জীবনে এই ধারণায় এসেছে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিবর্তন। এখন বিড়াল, বিদেশি জাতের কুকুর, পাখি কিংবা অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছ কেবল শখের বস্তু নয়, বরং পরিবারের একেকজন অবিচ্ছেদ্য সদস্য হয়ে উঠছে।
বাঙালি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে পোষা প্রাণীকে আপন করে নেওয়ার এই প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
পরিবারে মিলছে ‘সন্তানের’ মর্যাদা: এক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
শহুরে একাকীত্ব, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন এবং কর্মব্যস্ত জীবনের মানসিক চাপ কমাতে পোষা প্রাণী এখন বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা এক গৃহিণী জানান:
“আমার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার জন্য বাইরে থাকে। ঘরটা একদম খালি লাগত। দুই বছর আগে একটা পারসিয়ান বিড়াল এনেছি। এখন ওকে আমরা নিজেদের সন্তানের মতোই মনে করি। ও পুরো ঘরের একাকীত্ব দূর করে দিয়েছে।”
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটালে মানুষের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ ও ‘সেরোটোনিন’ হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা মানসিক অবসাদ ও একাকীত্ব দূর করতে দারুণ কার্যকর। এই কারণেই অভিভাবকরা এখন সন্তানদের মানসিক বিকাশের জন্যও ঘরে পোষা প্রাণী রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
হাতের নাগালে মিলছে ‘পেট ফুড’ ও এক্সেসরিজ
পোষা প্রাণীর এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশের অর্থনীতিতেও যুক্ত হয়েছে নতুন এক বাণিজ্যিক খাত। আগে যেখানে পোষা প্রাণীর জন্য বিশেষ খাবারের কথা ভাবাই যেত না, আজ দেশের সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার মুদি দোকানেও মিলছে হরেক রকমের পোষা প্রাণীর খাবার (Pet Food)।
খাবারের সহজলভ্যতা: ক্যাট ফুড (যেমন: হুইসকাস, মিও), ডগ ফুড, পাখির প্রিমিয়াম সীড মিক্স এখন অত্যন্ত সহজলভ্য।
বিশেষায়িত শপ: ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় বড় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে শত শত ‘পেট শপ’। যেখানে বিড়াল-কুকুরের শ্যাম্পু, বেল্ট, খেলনা, লিটার বক্স থেকে শুরু করে তাদের থাকার সুন্দর ঘরও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।
ই-কমার্স ও হোম ডেলিভারি: অনলাইন শপ ও বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই এখন পোষা প্রাণীর সব প্রয়োজনীয় পণ্য অর্ডার করা যাচ্ছে।
আধুনিক চিকিৎসাসেবা ও ‘পেট হাসপাতাল’
পোষা প্রাণীকে পরিবার মেনে নেওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাদের চিকিৎসার প্রতি যত্ন। বাংলাদেশে এখন পশু চিকিৎসার (Veterinary) মান অনেক উন্নত হয়েছে।
টিকা দেওয়া (Vaccination), কৃমিমুক্তকরণ (Deworming) থেকে শুরু করে যেকোনো জটিল রোগের জন্য এখন দেশে আধুনিক ‘পেট ক্লিনিক’ ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এমনকি সরকারি প্রাণিসম্পদ হাসপাতালগুলোতেও এখন পোষা প্রাণীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
এক নজরে বাংলাদেশে পেট কালচারের বর্তমান চিত্র:
| পরিবর্তনের ক্ষেত্র | বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬) |
| সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি | প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা কমেছে, পরিবারে সদস্যের মর্যাদা পাচ্ছে। |
| বাজারের পরিধি | পাড়ার দোকানেও বিড়াল-কুকুরের রেডিমেড খাবার (Pet Food) মিলছে। |
| ডিজিটাল প্রভাব | সোশ্যাল মিডিয়ায় পোষা প্রাণীদের গ্রুপ ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। |
| চিকিৎসাসেবা | আধুনিক ভেটেরিনারি ক্লিনিক ও ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে। |
সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
পোষা প্রাণীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার বা প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে। রাস্তাঘাটের সাধারণ বিড়াল ও কুকুর (Local Breed) দত্তক নেওয়ার (Adopt) প্রবণতাও তরুণ প্রজন্মের মাঝে দারুণভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে পোষা প্রাণীর সংস্কৃতি বা ‘পেট কালচার’ এখন আর কোনো সাময়িক ট্রেন্ড নয়। এটি মানুষের মানবিকতাবোধের প্রকাশ এবং শহুরে জীবনের এক পরম মানসিক আশ্রয়। বাণিজ্যিক সুযোগ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির ফলে এই খাতটি আগামীতে আরও বড় রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য।

