
গলদা (Macrobrachium rosenbergii) হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বাদুপানি/লবনাক্ত পানির বড় চিংড়ি। এটি ৫ ppm‑এর নিচে লবণাক্ততার ঈষৎ লোনা পানিতে ভালো বৃদ্ধি লাভ করে, তাই দক্ষিণ‑পশ্চিমাঞ্চলের লবনশুষ্ক অঞ্চলে গলদা চিংড়ি চাষ বিশেষ করে লাভজনক।
১. লবণাক্ততা ও পানির পরিবেশ ঠিক করা
গলদা চিংড়ি স্বাদু পানি ও হালকা লবণাক্ত পানিতে চাষ করা যায়; লবণাক্ততা সাধারণত ৫ ppt (প্রতি হাজারে ৫ গ্রাম লবণ)‑এর নিচে রাখা উচিত। লবনাক্ততা যদি বেশি থাকে চিংড়িকে ধীরে ধীরে কম লবনাক্ততা থেকে বেশি লবনাক্তায় অভ্যস্থ করে নিলে মরার হার কম হয়।
দৈনিক লবণ মিশিয়ে পানির লবণাক্ততা স্থিতিশীল রাখলে চিংড়ির ডিম ও পোনা উৎপাদন ও বৃদ্ধি উন্নত হয়; আধুনিক প্রাকটিসে প্রতি মাসে প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম লবণ দেওয়া হয়।
২. পুকুর/ঘের নির্বাচন ও প্রস্তুতি
পুকুরের তলায় কাদা নরম হওয়া ভালো, কিন্তু গাছের পাতা বা জৈব বর্জ্য জমা থাকলে চিংড়ির জন্য উপযুক্ত নয়; এগুলো পচনে অক্সিজেন কমে চিংড়ি মারা যায়।
পুকুরে রাক্ষসে মাছ থাকলে গলদা চিংড়ির পোনা ও প্রাপ্তবয়স্ক চিংড়ি খেয়ে ফেলে; তাই পুকুর ভরাট করার আগে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা বা লবণ–ব্লিচিং পদ্ধতিতে পরিষ্কার করা জরুরি।
৩. পোনা নির্বাচন ও ছাড়ার মাত্রা
লাইসেন্সড হ্যাচারি থেকে স্বাস্থ্যবান, স্বচ্ছ দেহবর্ণের গলদা পোনা নেওয়া উচিত; পুকুরের গভীরতা ও জলের গুণমান ভালো হলে প্রতি একরে ৫,০০০–৭,০০০ পিস পোনা ছাড়া যায়।
লবনাক্ত পানিতে চাষের ক্ষেত্রে পোনা ধীরে ধীরে (অ্যাক্লাইমেজ) খাপ খাওয়ানো করে পুকুরে ছাড়তে হয়, যাতে হঠাৎ লবণাক্ততার পার্থক্যে চিংড়ি মারা না যায়।
৪. খাদ্য ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা
গলদা চিংড়ি স্বভোজী ও স্বাভাবিকভাবে পুকুরের জৈব পদার্থ, ছোট কীটপতঙ্গ ও মাইক্রোজীব খায়; তবু বাণিজ্যিকভাবে তৈরি চিংড়ি ফিড বা প্রোটিন‑সমৃদ্ধ খাদ্য দিলে বৃদ্ধি ও লাভ বাড়ে।
খাদ্য দেওয়ার সময় দিনের বেলা হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে দিতে হয়; পুকুরে প্রতিদিন কিছু জৈব প্রোবায়োটিক মিশানো নির্দেশিত হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ও জলের গুণমান উন্নত করে।
৫. জলের গুণমান ও রোগ নিয়ন্ত্রণ
পুকুরে pH ৭–৮ এবং দ্রবীভূত অক্সিজেন ৪–৫ মিলিগ্রাম/লিটারের উপরে রাখতে হয়; তাপমাত্রা ২৬–৩২°C‑এর মধ্যে থাকলে গলদা চিংড়ি সবচেয়ে ভালো বাড়ে।
পরজীবীনাশক (ডেল্টামেথ্রিন, সাইপারমেথ্রিন ধরনের কীটনাশক) ব্যবহার করা যাবে না; এগুলো লবনাক্ত পানির গলদা চিংড়িকে মারাত্মক ক্ষতি দেয়।
৬. খোলস বদল ও হিংস্রতা রোধ
গলদা চিংড়ি খোলস বদলের সময় অত্যন্ত নাজুক হয়; এই সময় সবল চিংড়ি দুর্বল ও খোলস খোলা চিংড়িকে ধরে খেয়ে ফেলে।
খোলস বদলানোর আগে পুকুরে প্রচুর প্রোবায়োটিক ও ক্যালসিয়াম ধারণাকারী জিওলাইট মিশানো হয় (শতকে ১৫০–২০০ গ্রাম), যা দ্রুত খোলস শক্ত করে ও হিংস্রতা কমায়।
৭. মিশ্রচাষ (লবনাক্ত পানির ক্ষেত্রে)
অল্প লবনাক্ত পানিতে গলদা চিংড়িকে কার্প জাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল)‑এর সাথে মিশ্রচাষ করা যায়; এটি জমি ও জলের ব্যবহার সর্বোচ্চ করে।
তবে মিশ্রচাষে পোনা ও প্রতি শতকে মাছ ছাড়ার মাত্রা যথাযথভাবে ক্যালকুলেট করতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতা ও রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কম থাকে।
৮. সংগ্রহকরণ ও বাজারজাতকরণ
গলদা চিংড়ি সাধারণত ৬–৮ মাসে বাজারজাত আকারে (২০–৩০ গ্রাম/পিস) পৌঁছায়; লবনাক্ত পানিতে সঠিক পরিচর্যায় প্রতি শতকে প্রায় ৪–৫ কেজি করে উৎপাদন সম্ভব।
সংগ্রহের সময় পুকুরের পানিস্তর ধীরে ধীরে কমিয়ে নেট বা হ্যান্ড‑ণেট দিয়ে চিংড়ি ধরা হয়; পচা বা অসুস্থ চিংড়ি পার্থক্য করে বাদ দিলে বাজারমূল্য ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে।
৯. লবনাক্ত পানি চাষের সুবিধা ও মূল টিপস
লবনাক্ত বা মিশ্র পানির পুকুরে গলদা চাষ করলে স্বাদু পানির চেয়ে শতকরা উৎপাদন ও গড় ওজন বেড়ে যায়, কারণ এগুলো প্রাকৃতিকভাবে হালকা লবণাক্ত নদীতে থাকে।
প্রধান টিপস:
- লবণাক্ততা স্থিতিশীল রাখুন (৫ ppt এর নিচে),
- পুকুর প্রস্তুতিতে রাক্ষসে মাছ ও পরজীবীনাশক ব্যবহার নিষেধ,
- জিওলাইট ও প্রোবায়োটিক নিয়মিত দিন,
- স্থানীয় মৎস্য বিভাগ বা গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

