Friday, 30 October, 2026

বোরো চাষাবাদ ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবে সেচ ও সার নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক


সেচের সুবিধা বৃদ্ধি, অনুকূল আবহাওয়া, ন্যায্যমূল্য এবং পতিত জমি চাষে আনার ফলে ধান উৎপাদনের অন্যতম মৌসুম বোরোর চাষাবাদ ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বার্ষিক ধান উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে এই মৌসুম থেকে।

আবাদ ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বোরোর আবাদ হয়েছিল ৪৮ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি।

আরো পড়ুন
স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: কম খরচে লাভজনক আনারকলি (Passion Fruit) চাষ পদ্ধতি ও যত্ন
বাংলাদেশে আনারকলি চাষ

বাংলাদেশের কৃষিতে সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রচলিত ফল ও সবজি চাষে বিপ্লব ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক নাম হলো Read more

লেয়ার মুরগি পালনঃ লেয়ার মুরগির ফার্মে কখন কি টিকা দিতে হবে?
লেয়ার মুরগির ফার্মে কখন কি টিকা দিতে হবে?

লেয়ার মুরগির খামারে রোগের ঝুঁকি দূর করতে এবং সঠিক ডিম উৎপাদন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বয়স অনুযায়ী টিকা (Vaccine) দেওয়া আবশ্যক। Read more

উৎপাদনও বেড়েছে। ২০২২ অর্থবছরে বোরো ধান উৎপাদিত হয়েছিল ২ কোটি ১ লাখ টন, যা ২০২৫ অর্থবছরের শেষ মৌসুমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ টনে। চলতি মৌসুমে ডিএই’র লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ২৪ লাখ টন বোরো উৎপাদন।

সাফল্যের নেপথ্যে সরকারি উদ্যোগ

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, “পতিত জমি চাষের আওতায় আনার জন্য সরকারের বেশ কয়েকটি উদ্যোগই আবাদ বৃদ্ধির মূল কারণ।” তিনি জানান, দক্ষিণাঞ্চলে যেখানে আগে চাষ হতো খুব কম, সেখানে নতুন ধানের জাত ও কৃষকদের উৎসাহ বৃদ্ধির ফলে এখন জমি ব্যবহার হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের খাল খনন ও লো-লিফট পাম্প স্থাপনের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, হাওর অঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকা, যেখানে আগে বোরো চাষ হতো না, সেখানেও এখন ধান উৎপাদন হচ্ছে। গত পাঁচ থেকে সাত বছরে ধীরে ধীরে এ পরিবর্তন এসেছে।

গত দুই-তিন বছর ধরে অনুকূল আবহাওয়াও ফলন স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে। এ সময়ে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফসলের ওপর আঘাত হানেনি।

বাজার পরিস্থিতি: দাম কমায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বোরোর আবাদ বেড়েছে ঠিকই, তবে সম্প্রতি বাজারে মোটা ধানের দাম কমেছে। কারণ, আমদানি ও আগের আমন মৌসুমের (মোট ধানের প্রায় ৪০ শতাংশ) ভালো ফলনের জোগান বেড়েছে। এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ জ্বালানি ও সারের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত এক মাসে ঢাকার বাজারগুলোতে মোটা ধানের খুচরা দাম ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকায় নেমেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাজারে ধানের দাম কমায় মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা কমেছে, তবে এ মৌসুমে কৃষক যেন কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য না হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। “কৃত্রিম মূল্য কারসাজি ঠেকাতে এবং কৃষককে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারকে সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর কার্যকর ও পূর্ণ নিশ্চিত করতে হবে।”

ডিএই’র ফিল্ড সার্ভিসেস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, গত চার বছরে বোরো চাষ বৃদ্ধির মূল কারণ সিলেট অঞ্চলের মতো কিছু এলাকায় চাষে আগ্রহ বেড়ে যাওয়া। সিলেটের অনেক জমি বোরো মৌসুমে পতিত থাকত, কারণ পাথরের সমস্যায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলা কঠিন ছিল। পরে সেচের ব্যবস্থা চালু হলে আগে যেখানে চাষ হতো না, সেই ছোট ছোট ‘পকেট’ এলাকাতেও কৃষক বোরো চাষ শুরু করেন।

তিনি বলেন, শিলাবৃষ্টি না হলে প্রকৃত উৎপাদন ২ কোটি ১৭ থেকে ২ কোটি ১৮ লাখ টন পর্যন্ত হতে পারে। ডিএই’র তথ্যানুযায়ী, সিলেট বিভাগে এ মৌসুমে মোট বোরো আবাদের আয়তন কিছুটা বেড়েছে।

সিলেট বিভাগের ডিএই’র অতিরিক্ত পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, হাওর এলাকায় পানি কমে গেলে আবাদি জমি বেড়ে যায়, ফলে চাষ বাড়ে। তবে অকাল বৃষ্টি হলে এসব এলাকায় পানি জমে যায় এবং নিষ্কাশন কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি জানান, আগামী ৭ এপ্রিল থেকে বোরো ধান কাটা শুরু হবে। পহেলা বৈশাখ থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। তবে যাঁরা আগাম চাষ করেছেন, তাঁরা ইতিমধ্যে ধান কাটা শুরু করে দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, গত দুই-তিন মৌসুমে দেশে আউশ ও আমন চাষের সময় আবহাওয়া প্রতিকূল ছিল। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। ফলে কৃষকদের মধ্যে বোরোর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে—যা বোরো আবাদের জমি বাড়ার অন্যতম কারণ।

বিদ্যমান শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ

তবে তিনি আশঙ্কা করেন, এ বছর ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকদের প্রত্যাশিত ফলনের চেয়ে কিছুটা কম ফলন হতে পারে, কারণ পর্যাপ্ত সেচ দিতে পারছেন না অনেকে। বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থার প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেলচালিত। এছাড়া দেশের অনেক স্থানে সার সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

0 comments on “বোরো চাষাবাদ ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবে সেচ ও সার নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ