
বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ বা ‘ব্লু-ইকোনমি’ (নীল অর্থনীতি)-র অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে সরকার। এই অর্থ দেশের সামুদ্রিক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হবে।
আজ সংসদে উপস্থাপিত বাজেট প্রস্তাবনা থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গবেষণা ও উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, মোট ২০০ কোটি টাকার তহবিলটি দুটি সমান ভাগে ভাগ করে ব্যবহার করা হবে:
ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ ফান্ড: সমুদ্র গবেষণাকে গতিশীল করতে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য ‘ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ ফান্ড’ বা গবেষণা তহবিলের নামে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাত: নীল অর্থনীতির সামগ্রিক সম্প্রসারণ ও কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বাকি ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির মেগা টার্গেট
সরকার সমুদ্রের বিশাল মৎস্য ও খনিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে সামুদ্রিক মৎস্য ও সম্পদ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৪৫ কোটি (৪৫০ মিলিয়ন) ডলার, সেখানে নতুন এই মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে টুনা শিকার ও মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে জোরদার করতে সরকারের বেশ কয়েকটি বড় পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান:
গভীর সমুদ্রে মৎস্য শিকার: গভীর সমুদ্র থেকে টুনা (Tuna) এবং অন্যান্য উপরিভাগের সামুদ্রিক মাছ (Pelagic fish) শিকারের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ বা ভেসেল পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
শৈবাল চাষের সম্প্রসারণ: উপকূলীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে সিউইড বা সামুদ্রিক শৈবাল (Seaweed) চাষের পরিধি বাড়ানো হবে।
নতুন মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া: সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা জোরদার করতে কুয়াকাটা এবং সলিমপুরকে নতুন ‘মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া’ বা সামুদ্রিক সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
মাতারবাড়িতে আধুনিক ফিশিং পোর্ট ও কক্সবাজার ল্যান্ডিং সেন্টারের আধুনিকায়ন
সমুদ্রসম্পদের টেকসই ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়নেও হাত দিচ্ছে সরকার।
কক্সবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) ঐতিহ্যবাহী মাছ অবতরণ কেন্দ্রটিকে (Fish Landing Centre) আধুনিকায়ন ও আপগ্রেড করার একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
এছাড়া, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে একটি আধুনিক ফিশিং পোর্ট বা মৎস্য বন্দর স্থাপন করা হবে।
এক নজরে ব্লু-ইকোনমি বাজেট ও পরিকল্পনা:
| বিষয়ের নাম | লক্ষ্য ও বরাদ্দ |
| মোট প্রস্তাবিত তহবিল | ২০০ কোটি টাকা। |
| গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল | যথাক্রমে ১০০ কোটি ও ১০০ কোটি টাকা। |
| রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা (২০৩০) | ১ বিলিয়ন ডলার (বর্তমানে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার)। |
| নতুন সুরক্ষিত অঞ্চল | কুয়াকাটা ও সলিমপুর। |
| অবকাঠামো উন্নয়ন | মাতারবাড়িতে আধুনিক ফিশিং পোর্ট ও কক্সবাজারে আপগ্রেড ল্যান্ডিং সেন্টার। |
অর্থনীতিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সমুদ্রসীমা জয় করার পর ব্লু-ইকোনমি খাতে এটাই সরকারের অন্যতম বড় এবং সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের প্রস্তাব। টুনা মাছ শিকার, আধুনিক ফিশিং পোর্ট এবং গবেষণায় এই বরাদ্দ সঠিক উপায়ে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব কিছু নয়।

