সারাদেশে মাঠপর্যায়ে আমন ধানের আবাদ পুরোদমে চলছে। এই সময়ে কৃষকদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার। সরকারি তথ্যমতে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় মজুত অনেক বেশি। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদামতো সার না পেয়ে কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আর সুযোগ বুঝে অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃষকের হাতে তা না পৌঁছানোয় দেশের বিদ্যমান সার বিতরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
মজুত বনাম বাস্তব সংকট: কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও মাঠের চিত্র
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের সম্ভাব্য চাহিদা ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এর বিপরীতে বর্তমানে সরকারি গুদামে মজুত রয়েছে ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন সার বেশি মজুত আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, মাঠপর্যায়ে সারের এই সংকট সারের পরিমাণের নয়, বরং বিতরণ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া জটিলতার কারণে। আমন মৌসুমে যখন সারের চাহিদা তুঙ্গে, ঠিক তখনই সরকার নতুন ডিলার নীতিমালা বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যা এই সংকটকে উসকে দিয়েছে।
নতুন ডিলার নীতিমালা ও বিতরণ ব্যবস্থায় ধস
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ‘সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। এই নতুন নীতিমালার আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ তিনটি ডিলার ইউনিট রাখা যাবে। যোগ্য পুরোনো ডিলাররা বহাল থাকবেন এবং পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে আরও একজন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে শর্ত হলো, একজন ব্যক্তি একটির বেশি ডিলারশিপ রাখতে পারবেন না।
এই পরিবর্তনটি এমন এক সময়ে কার্যকর করা শুরু হয়, যখন মাঠে আমন আবাদ চলছে এবং সামনে রবি মৌসুম। কর্মকর্তারা জানান, ডিলার ব্যবস্থা সংশোধনের কাজ জুনে শুরু হলেও বারবার পরিবর্তনের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া সারের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে গিয়ে ঠেকেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগস্টের শুরু থেকেই আমন আবাদ শুরু হয় এবং কৃষকদের বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন হয়। ঠিক এই সময়ে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিদ্যমান ডিলারদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডিলারশিপে শূন্যতা, নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর নিয়ে ধোঁয়াশা এবং পুরোনো ডিলারশিপ বাতিলের গুঞ্জনের কারণে অনেক ডিলার গুদাম থেকে সার তোলার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ একেবারেই সার তুলছেন না।
ডিলারদের অসহযোগিতা ও কৃত্রিম সংকট
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, জুলাই ও আগস্টে ডিলাররা সরকারি গুদাম থেকে তাদের বরাদ্দের মাত্র প্রায় অর্ধেক সার উত্তোলন করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, কিছু ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বরাদ্দের সার তোলেনি।
গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের অনেকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট খালি হয়েছে। সরকার এই শূন্যস্থান পূরণ এবং ডিলার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে প্রায় ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
তবে কৃষিবিদদের মতে, সারের চাহিদা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হওয়ায় আগে থেকেই দুর্বল ডিলার নেটওয়ার্ক আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের টাইমিং ভুল ছিল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভুক্তভোগী কৃষক ও গণঅসন্তোষ
বিতরণ ব্যবস্থার এই হযবরল অবস্থার কারণে কুড়িগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় কৃষকেরা বারবার ডিলারের গুদামে গিয়েও সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন। এর ওপর সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ নিত্যদিনের। সার না পেয়ে এবং অতিরিক্ত দামের প্রতিবাদে কয়েকটি এলাকায় কৃষকরা বিক্ষোভও করেছেন।
সরকারের পদক্ষেপ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত
সার বিতরণ স্বাভাবিক রাখতে সরকার তদারকি ও অভিযান জোরদার করেছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। গত ২৮ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ২৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে এবং চার জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ মাঠের সংকট দূর করতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিএফএর কঠোর হুঁশিয়ারি
এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহে কোনো ধরনের অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অতিরিক্ত মূল্য আদায় বরদাশত করা হবে না বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)।
বিএফএ চেয়ারম্যান মো. মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও অসাধু ও অসংগঠিত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ডিলারদের গুদাম লুট করে সার সংকট তৈরির অপচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিজ্ঞপ্তিতে বিএডিসি, বিসিআইসি ও বেসরকারি খাতের বরাদ্দকৃত ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার নির্ধারিত সময়ে উত্তোলন করে নিজস্ব গুদামে সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির জন্য ডিলারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও তা কৃষকের জমিতে পৌঁছাতে না পারা সরকারের সরবরাহ চেইন ম্যানেজমেন্টের এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিতরণ ব্যবস্থা সচল করা না গেলে আমন ও আসন্ন রবি মৌসুমের ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

