জয়পুরহাটে চলতি মৌসুমে কলার বাম্পার ফলন হলেও মুখে হাসি নেই চাষিদের। বাজারে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলার দামে ব্যাপক ধস নেমেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ। ফলে উৎপাদন খরচ তো ওঠা দূরের কথা, বিঘাপ্রতি অন্তত ১০ হাজার টাকা করে লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার শত শত কলাচাষি।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক ছড়ি কলা বর্তমানে বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। অথচ কিছুদিন আগেই একই মানের এক ছড়ি কলা বিক্রি হয়েছিল ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকায়। বাজারে কলার সরবরাহ বাড়লেও ক্রেতার চরম খরা দেখা দিয়েছে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও লোকসানের হিসাব
সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি মৌসুমে কলা চাষের খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। বর্তমান বাজারদরে কলার ফলন বিক্রি করে খরচের টাকাই তুলতে পারছেন না কৃষকেরা।
বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ: ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা।
বর্তমান বিক্রয়মূল্য: ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা।
বিঘাপ্রতি নিট লোকসান: ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৮১৭ হেক্টর জমিতে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে ৭০৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে ৩১,০৮১ মেট্রিক টন। জেলায় সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে মানিক, সাগর ও চিনিচাম্পা জাতের কলা। মৌসুমের শুরুতে মানিক কলা বিক্রি করে আগাম ভালো দাম পেলেও সরবরাহ বাড়তেই কলার বাজারে ধস নামে।
চাষিদের ক্ষোভ ও ব্যবসায়ীদের পাল্টা দাবি
জামালগঞ্জ গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা সিন্ডিকেট করে কম দামে আমাদের কলা কিনতে বাধ্য করছেন। পূর্বেও সরবরাহ বেশি থাকলেও এত দাম কমেনি, আমরা এখন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি।”
একই এলাকার কৃষক মাহবুব হোসেন আক্ষেপ নিয়ে জানান, এক বিঘা জমিতে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে চিনিচাম্পা কলা চাষ করেও উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে বাধ্য হয়ে কলাগাছ কেটে সেখানে ধান চাষ শুরু করেছেন।
তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। জামালগঞ্জ বাজারের প্রবীণ কলা ব্যবসায়ী খাদেমুল ইসলাম চান্দু জানান, “সিন্ডিকেটের কারণে নয়, বরং সারা দেশেই কলার আমদানিকৃত সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন মোকামে কলার চাহিদা কম থাকায় প্রতি ছড়ি কলায় আমাদেরও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে।”
এক নজরে জয়পুরহাটের কলা চাষের চিত্র:
| সূচক / বিবরণ | তথ্যাদি ও পরিসংখ্যান |
| চলতি বছরের চাষের লক্ষ্যমাত্রা | ৮১৭ হেক্টর (অর্জিত: ৭০৫ হেক্টর) |
| মোট উৎপাদন | ৩১,০৮১ মেট্রিক টন |
| প্রধান জাতসমূহ | মানিক, সাগর ও চিনিচাম্পা |
| ছড়িপ্রতি কলার বর্তমান দাম | ৩০০ – ৩৫০ টাকা (পূর্বে ছিল ৯০০ – ১০০০ টাকা) |
| বিঘাপ্রতি সম্ভাব্য লোকসান | ১০,০০০ টাকা বা তার বেশি |
বাজার স্থিতিশীল করতে আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস
জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, চাষিরা যেন কলার ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে বাজার নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। চাষিদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

