
ভোরের আলো ফুটতেই যে খামারগুলো কয়েক হাজার মুরগির কলকাকলিতে মুখরিত হতো, সেখানে এখন কেবলই নিস্তব্ধতা। টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরের খামারি আলমগীর হোসেনের গল্পটি এখন দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারির সাধারণ চিত্র। উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশের আমিষের প্রধান উৎস পোল্ট্রি খাত।
উৎপাদন খরচ ১০ টাকা, বিক্রি ৮ টাকায়: খামারিদের আর্তনাদ
দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন খামারি আলমগীর হোসেন জানান, আগে তার খামারে প্রতিদিন ১০ হাজার ডিম উৎপাদন হতো। এখন লোকসানের মুখে অর্ধেক শেড বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“একটি ডিম উৎপাদনে আমার খরচ প্রায় ১০ টাকা, কিন্তু বাজারে তা অনেক সময় ৮ টাকায় বিক্রি করতে হয়। মাসের পর মাস এই লোকসান দেওয়া অসম্ভব।”
একই চিত্র ময়মনসিংহের ভালুকার শফিকুল ইসলামেরও। ১৫ হাজার মুরগির খামার টিকিয়ে রাখতে না পেরে শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি করে দেনা শোধ করেছেন তিনি। পশুখাদ্য বা ফিডের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিই এই সংকটের প্রধান কারণ।
ফিডের দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের পরিসংখ্যান
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। পোল্ট্রি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
গত ৫ বছরের তুলনামূলক চিত্র (২০২০ বনাম ২০২৫):
| খাতের নাম | ২০২০ সালের দর | ২০২৫ সালের দর | বৃদ্ধির হার |
| পোল্ট্রি ফিড (প্রতি বস্তা) | ২,১০০ – ২,২০০ টাকা | ৩,৫০০ – ৩,৬০০ টাকা | ৬০-৬৫% |
| ডিমের পাইকারি মূল্য (পিস) | ৬ – ৭ টাকা | ৮ – ৯ টাকা | ২০-২৫% |
| ব্রয়লার মুরগি (প্রতি কেজি) | ১২০ – ১৩০ টাকা | ১৪০ – ১৫০ টাকা | ১৫-২০% |
খামারিদের দাবি, ফিডের দাম ৬০ শতাংশ বাড়লেও উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়েছে মাত্র ১৫-২৫ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধানই খামারিদের পথে বসাচ্ছে।
করের বোঝা: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
চলতি অর্থবছরে কর কাঠামোর পরিবর্তন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্যমতে:
করপোরেট কর: ১৫% থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫% করা হয়েছে।
অগ্রিম আয়কর (AIT): ১% থেকে বাড়িয়ে ৫% করা হয়েছে।
টার্নওভার কর: ০.৬% থেকে বাড়িয়ে ১% করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (BPIA) সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, “ফিড কোম্পানিগুলো করের চাপে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খামারিদের ওপর। বর্তমানে এক কেজি ব্রয়লার উৎপাদনে খরচ ১৪৬ টাকা, অথচ বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৪৫-১৪৮ টাকায়। লাভ বলতে কিছুই নেই।”
আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় প্রতিকূল পরিবেশ
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত অনেক বেশি করের বোঝা বইছে। থাইল্যান্ডে ফিড শিল্পে ৫-৮ বছরের কর মওকুফ সুবিধা দেওয়া হয়। মালয়েশিয়া ও ভারতও আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর বিশেষ ছাড় দেয়।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিপন কুমার মন্ডল পরামর্শ দেন:
“ফিডের দাম না কমিয়ে এই খাতকে বাঁচানো সম্ভব নয়। আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো এবং করপোরেট কর ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা জরুরি।”
হুমকির মুখে কর্মসংস্থান ও পুষ্টি নিরাপত্তা
পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০-৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বিপিআইএর মহাসচিব সাফির রহমান সতর্ক করে বলেন, আগামী বাজেটে নীতি সহায়তা না পেলে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য ডিম ও মুরগি কেনা সাধ্যের বাইরে চলে যাবে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রোটিনের সহজলভ্য এই উৎসটি বাঁচাতে এখন সরকারের বিশেষ নজরদারি ও নীতিমালার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসুত্রঃ tbsnews

