Thursday, 09 April, 2026

পাহাড়ি অঞ্চলের ধারণা ভেঙে সমতলে চায়ের বিপ্লব: কাপাসিয়ায় অভাবনীয় সাফল্য


পাহাড়ি অঞ্চলের ধারণা ভেঙে সমতলে চায়ের বিপ্লব: কাপাসিয়ায় অভাবনীয় সাফল্য

চা চাষ মানেই পাহাড়—দীর্ঘদিনের এই প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার একটি অগ্রগামী উদ্যোগ। সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলের বাইরেও বাংলাদেশের সমতলে যে উন্নত মানের চা উৎপাদন সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন আইইউবিএটি (IUBAT)-এর শিক্ষক অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান। উপজেলার চিনাদুলি গ্রামে এক হেক্টর জমিতে গড়ে তোলা তার চা বাগান এখন কৃষি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

যেভাবে শুরু এই যাত্রা

চা শিল্পে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যাপক লুৎফর রহমান ২০১৯ সালে এই প্রকল্প শুরু করেন। কাপাসিয়ার বৃষ্টিপাত এবং ভূ-প্রকৃতির সাথে সিলেটের মিল দেখে তিনি এই সাহসী পদক্ষেপ নেন। তিনি বলেন, “মাটির গঠন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা না করলেও, এখানকার ভূ-প্রকৃতি অনুকূল মনে হওয়ায় আমি চাষ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেই।” শ্রীমঙ্গল থেকে ২০ হাজার চারা সংগ্রহ করে পাঁচটি প্লটে রোপণ করার মাধ্যমেই এই বাগানের যাত্রা শুরু হয়।

আরো পড়ুন
লাভজনক হলুদ চাষে কৃষকের করণীয়: আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও সঠিক পরিচর্যা
হলুদ শুধু একটি অতি প্রয়োজনীয় মশলাই নয়, এটি বর্তমানে অত্যন্ত লাভজনক একটি অর্থকরী ফসল।

হলুদ শুধু একটি অতি প্রয়োজনীয় মশলাই নয়, এটি বর্তমানে অত্যন্ত লাভজনক একটি অর্থকরী ফসল। স্বল্প খরচ ও পরিশ্রমে বেশি ফলন Read more

লবনাক্ত পানিতে গলদা চিংড়ি চাষে করণীয় ধাপসমূহ: লাভজনক আধুনিক পদ্ধতি
লবনাক্ত পানিতে গলদা চিংড়ি চাষে করণীয় ধাপসমূহ: লাভজনক আধুনিক পদ্ধতি

গলদা (Macrobrachium rosenbergii) হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বাদুপানি/লবনাক্ত পানির বড় চিংড়ি। এটি ৫ ppm‑এর নিচে লবণাক্ততার ঈষৎ লোনা পানিতে ভালো Read more

উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ

বর্তমানে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী এই বাগানগুলো থেকে ফলন আসতে শুরু করেছে। উৎপাদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

  • ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাগান থেকে প্রায় ১০০ কেজি গ্রিন টি সংগ্রহ করা হয়।

  • ২০২৪ সালে উৎপাদন কিছুটা কমে ৬০ কেজি হলেও, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৭৬ কেজিতে দাঁড়িয়েছে।

  • ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫০ কেজি।

বর্তমানে অনলাইন থেকে শেখা চীনা পদ্ধতিতে হাতেই গ্রিন টি তৈরি করছেন অধ্যাপক রহমান। তিনি জানান, “পাতা তোলার পর খুব গরম পানিতে দুই মিনিট ফুটিয়ে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করি।” ভবিষ্যতে যান্ত্রিক উৎপাদন এবং নিজস্ব ব্র্যান্ডিং করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

স্থানীয়দের উৎসাহ ও কর্মসংস্থান

এই চা বাগানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসী মনে করছেন, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আনবে। স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেনের মতে, অন্য ফসলের তুলনায় চা চাষে খরচ কম কিন্তু মুনাফা বেশি, যা বেকারত্ব দূর করতে সহায়ক হবে। প্রতিবেশী আসমা খাতুনও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই বাগান হওয়ায় তাদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আউলিয়া খাতুন জানান, এখানকার মাটি চা চাষের জন্য উপযুক্ত। নতুন করে কেউ যদি চা চাষে আগ্রহী হন, তবে কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

কাপাসিয়ার এই সাফল্য বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে কৃষি বৈচিত্র্যকরণে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রথাগত চাষাবাদের সীমানা ছাড়িয়ে এই উদ্যোগ এখন কৃষি উদ্ভাবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

0 comments on “পাহাড়ি অঞ্চলের ধারণা ভেঙে সমতলে চায়ের বিপ্লব: কাপাসিয়ায় অভাবনীয় সাফল্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ