Thursday, 16 July, 2026

হাওরে গোখাদ্যের তীব্র সংকট: লোকসানে কোরবানির পশু বিক্রি করছেন কৃষকরা


আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশুর ভালো দাম পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। কিন্তু অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টি সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছে। ধানের সাথে পচে গেছে খড়, ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র গোখাদ্য সংকট। নিরুপায় হয়ে বাজার থেকে চড়া দামে খড় ও ভুষি কিনতে না পেরে কোরবানির আগেই কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের শত শত কৃষক।

ধানের সাথে গেছে খড়ও: সংকটে কৃষক

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মধ্যনগর-ধর্মপাশা এলাকায় ক্ষতির চিহ্ন এখন স্পষ্ট। ধান কোনোমতে আধা-পাকা অবস্থায় কাটতে পারলেও বৃষ্টির কারণে খড় শুকানো সম্ভব হয়নি। ফলে মাঠেই পচে গেছে গরুর প্রধান খাদ্য খড়।

আরো পড়ুন
লাভজনক গলদা চিংড়ি চাষ: পোনা ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুত করার আধুনিক ও সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশী মৎস্য চাষিদের কাছে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা চিংড়ি চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। তবে গলদা চিংড়ি চাষে সফলতার প্রধান Read more

বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা: মোটা চাল কেটে সরু করার রমরমা বাণিজ্য
বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নাজিরশাইল, চাঁন্দিনাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী ধান বিলীন হয়ে গেছে। অথচ দেশের চালের বাজারে গেলে এখনো Read more

মোহনগঞ্জের কৃষক মো. নাসির আক্ষেপ করে বলেন:

“বন্যায় ধান তলিয়ে যাওয়ায় খড় তুলতে পারিনি। কোরবানির জন্য দুটি ষাঁড় বড় করেছিলাম, কিন্তু খাবারের অভাবে গত সপ্তাহে একটি বিক্রি করে দিতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকায়। ঈদের সময় হলে এর দাম আরও অনেক বেশি হতো।”

অনুরূপ পরিস্থিতি কৃষক আজহারুল ইসলামের। ডিঙ্গাপোতা হাওরের ১৫০ শতাংশ জমির ধান হারিয়ে এখন নিজের খোরাক আর গরুর খাদ্য জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। বাধ্য হয়ে তার প্রিয় গরুটি মাত্র ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন।

খড়ের দাম বেড়েছে তিনগুণ

গোখাদ্য সংকটের সুযোগে বাজারে খড়ের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। নেত্রকোনার মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও খামারি মো. দিলাল মিয়া জানান, গত বছর এক কাঠা জমির খড় যেখানে ৫০০-৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, এবার তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। চড়া দামে খড় কিনে খামার টিকিয়ে রাখা ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পরিসংখ্যান: পশুর মজুদ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

জেলা প্রাণিসম্পদ ও কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দুই জেলায় কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত থাকলেও খাদ্য সংকট এখন প্রধান বাধা।

ক্ষয়ক্ষতির এক নজরে পরিসংখ্যান:

জেলাকোরবানিযোগ্য পশুক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমি (হেক্টর)আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ (আনুমানিক)
নেত্রকোনা১,৩৬,৬৮৮টি১৮,৪৭৮ হেক্টর৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা
সুনামগঞ্জ৫৩,৪০১টি১৬,৩৯৫ হেক্টরপ্রায় ৫০০ কোটি টাকা

সরকারি ভাষ্য ও বাস্তবতা

সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বর্তমানে সংকটের কথা অস্বীকার করলেও ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কার কথা জানান। তার মতে, লাভ পাওয়ার আশায় কৃষকরা এখন গরু বিক্রি করছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন।

ধর্মপাশার কৃষক মতি মিয়া জানান ভিন্ন কথা:

“২০ দিন আগে ধান কেটেছি, কিন্তু বৃষ্টির জন্য খড় শুকাতে পারিনি। খড় সব পচে গেছে। যাদের গরুর খাবার নেই, তারা বাধ্য হয়েই কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে।”

সংকটে কৃষি অর্থনীতি

কৃষি বিভাগের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, নেত্রকোনায় ১৬ হাজার ৮৭৭ হেক্টরের বেশি জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় ৭৭ হাজার কৃষকের ওপর। একইভাবে সুনামগঞ্জেও ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খড় সংকটের কারণে এই অঞ্চলের পশুপালন খাতের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকারি বিশেষ প্রণোদনা ও গোখাদ্য সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ কৃষকরা।

0 comments on “হাওরে গোখাদ্যের তীব্র সংকট: লোকসানে কোরবানির পশু বিক্রি করছেন কৃষকরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ