Sunday, 12 July, 2026

হবিগঞ্জের হাওরে অসময়ের বন্যায় তলিয়ে গেল ব্যাপক বোরো জমি, চরম দুশ্চিন্তায় কৃষক


বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জের নিচু এলাকা প্লাবিত

হবিগঞ্জের হাওর এলাকায় কয়েক দিনের অসময়ে বৃষ্টি ও নদীপাড়ে পানি বাড়ায় ব্যাপক বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম দুশ্চিন্তা। ক্ষতি এড়ানোর কোনো উপায় না পেয়ে অনেকে এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

প্লাবিত এলাকাসমূহ

জানা গেছে, নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার নিচু এলাকার ধানক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সবচেয়ে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি বানিয়াচং উপজেলায়।

আরো পড়ুন
লাভজনক গলদা চিংড়ি চাষ: পোনা ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুত করার আধুনিক ও সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশী মৎস্য চাষিদের কাছে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা চিংড়ি চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। তবে গলদা চিংড়ি চাষে সফলতার প্রধান Read more

বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা: মোটা চাল কেটে সরু করার রমরমা বাণিজ্য
বাজারে ‘মিনিকেট-নাজিরশাইল’ প্রতারণা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নাজিরশাইল, চাঁন্দিনাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী ধান বিলীন হয়ে গেছে। অথচ দেশের চালের বাজারে গেলে এখনো Read more

সরকারি প্রাথমিক হিসাব

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ফসল) ও কৃষিবিদ মিল্টন বিশ্বাস জানান, মাঠ পর্যায়ে জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০৫ বিঘা জমি পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ জরিপ এখনো চলমান।

চেয়ারম্যানের উদ্বেগ

সুজাতপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাদিকুর রহমান বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে রত্না নদীর পাড়ে পানি ওঠায় আশপাশের হাওরগুলোতে পানি ঢুকছে। প্রতিদিন নতুন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭ হাজার বিঘা অপরিপক্ব ধানের জমি নিমজ্জিত হয়েছে।”

ক্ষতির প্রকট চিত্র (কৃষকদের বক্তব্য)

বানিয়াচংয়ের সুজাতপুর গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান জানান, উগলি, বাটাসার ও বালি হাওরের বিশাল এলাকার ধান ইতিমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। সুজাতপুর, ইকরাম ও শতমুখা হাওর মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার বিঘা জমি ডুবে গেছে বলে তার ধারণা।
ইকরাম গ্রামের কৃষক আহলাদ মিয়া বলেন, তিনি প্রতি বিঘা ৩ হাজার ৫০০ টাকা লিজ নিয়ে ৮ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছিলেন। ধান ভালোই হচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পুরো জমি এখন পানির নিচে। তিনি ঋণ করে চাষ করেছিলেন—এখন লোকসান কীভাবে পোষাবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।

উপজেলাভিত্তিক ক্ষতির বিবরণ

বানিয়াচং উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অলোক কুমার চন্দ জানান, এ উপজেলায় ৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। ভুগলি, ভোল্লুয়ার, রাজাখাই, হিজলি, বালি ও বাগের আগরসহ বেশ কয়েকটি হাওরে পানি জমেছে।
লাখাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদুল ইসলাম জানান, ধলেশ্বরী নদীর কাছে প্রায় ৬ হেক্টর বোরো ধান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।

বন্যার কারণ ও সম্ভাবনা

হবিগঞ্জের উপপরিচালক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, এই বন্যার প্রধান কারণ বৃষ্টির পানি। তিনি স্পষ্ট করেন, উজানের ঢল নয়, বরং টানা বৃষ্টিতেই হাওরগুলোতে পানি জমছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে হাওর এলাকায় এই মুহূর্তে তেমন কোনো প্রতিকার নেই। তবে বৃষ্টি কমে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

কৃষকের ক্ষোভ ও আশঙ্কা

এখনো বৃষ্টি থামেনি, পানি কমারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অনেক কৃষক ইতিমধ্যে জামিনে জমি বন্ধক রেখে বা উচ্চ সুদে ঋণ করে ধান রোপণ করেছিলেন। ফসল ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদের সামনে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে।

0 comments on “হবিগঞ্জের হাওরে অসময়ের বন্যায় তলিয়ে গেল ব্যাপক বোরো জমি, চরম দুশ্চিন্তায় কৃষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ