দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করা এবং বাজারে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পূর্বে অনুমোদিত ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ করা সুগন্ধি চাল রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মাঝারি ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের রপ্তানিকারকদের জন্য এই সংশোধিত বরাদ্দ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে পূর্বে প্রদান করা অনুমোদনের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
নজরদারি ও জবাবদিহিতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্ত
কোটা অর্ধেকে নামিয়ে আনার পাশাপাশি সুগন্ধি চাল রপ্তানি কার্যক্রমে কড়া নজরদারি, স্বচ্ছতা ও বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত আনা সুনিশ্চিত করতে ১০টি কঠোর শর্ত যুক্ত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়:
১. নীতি অনুসরণ: ‘রপ্তানি নীতি ২০২৪–২৭’-এর সব বিধান কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
২. মেয়াদ: রপ্তানি সংক্রান্ত সংশোধিত এই অনুমোদন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
৩. কাস্টমস যাচাই: প্রতিটি চালান কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের গুণগত মান ও সত্যতা নিশ্চিত করার পর ছাড়পত্র দেবে।
৪. নথি জমা: চালানের প্রতিটি কনসাইনমেন্ট জাহাজীকরণের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখায় জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৫. পূর্ববর্তী তথ্য প্রকাশ: ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানির আবেদন করলে আগের প্রাপ্ত কোটার বিপরীতে প্রকৃত রপ্তানির বিস্তারিত প্রমাণ দিতে হবে।
৬. সীমা লঙ্ঘন নিষিদ্ধ: সংশোধিত নির্ধারিত মেয়াদের চেয়ে ১ কেজি বেশি চালও কোনো অবস্থায় রপ্তানি করা যাবে না।
৭. সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য: বিশ্ববাজারে দর সুরক্ষায় প্রতি কেজি সগন্ধি চালের সর্বনিম্ন FOB রপ্তানিমূল্য ১.৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
৮. অহস্তান্তরযোগ্যতা: রপ্তানি অনুমোদন সম্পূর্ণ অহস্তান্তরযোগ্য; কোনো সাব-কন্ট্রাক্ট বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চাল পাঠানো যাবে না।
৯. বাতিলের এখতিয়ার: জাতীয় ও জনস্বার্থে সরকার যেকোনো সময় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই এই অনুমোদন বাতিল করতে পারবে।
১০. পিআরসি দাখিল: রপ্তানি আয় দেশে আসার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে পিআরসি (Proceeds Realization Certificate) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পূর্বের বরাদ্দ ও চালানের বর্তমান অবস্থা
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর আগে দুই দফায় ২৭৮টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ৪৫ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে কড়াকড়ির কারণে গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দেখা গেছে, ১২৯টি প্রতিষ্ঠান বাস্তবে মোট ২ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন চাল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে পেরেছে।
এক নজরে সুগন্ধি চাল রপ্তানির সংশোধিত নিয়মাবলী:
| বিষয় | নতুন ও সংশোধিত রূপরেখা |
| রপ্তানি কোটা হ্রাসের হার | ৫০ শতাংশ (অর্ধেক কম)। |
| পূর্বে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা | ২৭৮টি প্রতিষ্ঠান (কোটা ৪৫,২৭০ টন)। |
| সর্বনিম্ন FOB মূল্য | কেজিপ্রতি ১.৬০ মার্কিন ডলার। |
| অনুমোদনের মেয়াদ | ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। |
| বাধ্যতামূলক সনদ | বৈদেশিক মুদ্রা ফেরতের প্রমাণে PRC জমা। |
অভ্যন্তরীণ বাজার ও খাদ্য নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার
সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাধারণ মানুষের খাদ্যপণ্য হিসেবে চালের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চাল রপ্তানি একবারে পুরোপুরি বন্ধ না করে এভাবে নিয়ন্ত্রিত কোটা ও ১০টি কঠোর শর্ত প্রয়োগ করায় একদিকে যেমন চালের বৈশ্বিক বাজার হাতছাড়া হবে না, অন্যদিকে দেশে সুগন্ধি চালের বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং অসাধু মজুতদারদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হবে।

