
চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে প্রধান প্রধান নদ-নদীতে বড় ধরনের কোনো বন্যা না হওয়ায় চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়নি। এর ফলে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের প্রায় এক মাস আগেই রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আগাম রোপা আমন ধান, সবজি ও ভূট্টা চাষ শুরু করেছেন কৃষকেরা।
তবে এই অতিরিক্ত ও আগাম চাষাবাদের কারণে হঠাৎ করেই চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে সারের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় চর এলাকার কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ। সার সরবরাহের দাবিতে বেশ কিছু স্থানে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন।
বন্যা না থাকায় চরের বুকজুড়ে সবুজ ফসল
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, চলতি বছর ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, ফলে বড় কোনো বন্যার সৃষ্টি হয়নি। তিস্তা ও দুধকুমার নদের পানি সামান্য বাড়লেও তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নেমে যায়।
বন্যা না থাকার সুযোগে কৃষকেরা যথাসময়ের অনেক আগেই চরের পলিতে ফসল রোপণ করতে শুরু করেছেন:
আমন ধান: সাধারণত যেখানে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে চাষাবাদ শুরু হয়, সেখানে এবার সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আগাম আমনের চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে।
সবজি ও ভূট্টা: আগাম শীতকালীন সবজি চাষের পাশাপাশি ভূট্টা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুতের কাজ পুরোদমে চলছে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার চরের কৃষক বক্তার আলী জানান, গত বছর তিনি ৫ বিঘা জমিতে চাষ করলেও এবার কোনো বন্যা না থাকায় ৭ বিঘা জমিতে আগাম আমন রোপণ করেছেন। তবে চাহিদা মতো ডিলারের কাছে সার না পাওয়ায় তাকে বারবার ধরনা দিতে হচ্ছে।
ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ পথ পাড়ি, বরাদ্দ অপ্রতুল
চরাঞ্চলের কৃষকদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে সারের সহজলভ্যতা। চর পার্বতীর কৃষক হাসমত আলী জানান, আগে খোলা বাজারে সার পাওয়া গেলেও এখন চর থেকে ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ডিলার পয়েন্টে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে গিয়েও চাহিদামতো সার মেলে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর অঞ্চল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে:
আমন আবাদ: রংপুর অঞ্চলের ৫টি জেলায় (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা) মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে।
সবজি ও ভূট্টা: ৪৪,২৮৯ হেক্টরে সবজি (যার মধ্যে ৩,৬৫৬ হেক্টর আগাম) এবং ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৮৬ হেক্টরে ভূট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের বরাদ্দ: এ অঞ্চলে সেপ্টেম্বরে ২৩,৭৩৭ টন ইউরিয়া, ৩,৫৪৩ টন টিএসপি, ৭,৮৫৭ টন এমওপি এবং ১১,৬৯৮ টন ডিএপি সার বরাদ্দ ও বিতরণ করা হয়েছে।
এক নজরে চরাঞ্চলের সার সংকট পরিস্থিতি:
| বিষয় / সূচক | তথ্যাদি ও বর্তমান চিত্র |
| আবাদের সময়সূচি | চরে স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ১ মাস আগে (সেপ্টেম্বরের শুরুতে) চাষ শুরু। |
| কৃষকদের প্রধান ভোগান্তি | ডিলার পয়েন্ট ১০ কিমি দূরে, চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়া এবং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। |
| কুড়িগ্রামে জরুরি অতিরিক্ত বরাদ্দ | ১,০০০ টন ইউরিয়া, ৩০০ টন ডিএপি ও ৩২ টন টিএসপি দেওয়া হয়েছে। |
| কৃষি বিভাগের পদক্ষেপ | অতিরিক্ত আবাদী জমির চাহিদা নিরূপণ করে অক্টোবরের জন্য উচ্চপর্যায়ে চাহিদা পাঠানো। |
সংকট নিরসনে কৃষি বিভাগের তৎপরতা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর চরে অতিরিক্ত জমি আগাম চাষের আওতায় আসায় সারের সাময়িক সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন:
“সার বিতরণের খবর পেলেই চরের কৃষকেরা একযোগে ডিলার পয়েন্টে ভিড় জমান। চাহিদা অনুযায়ী সার না পেলেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বরে কুড়িগ্রামে অতিরিক্ত ১,০০০ টন ইউরিয়া, ৩০০ টন ডিএপি ও ৩২ টন টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আগামী অক্টোবর মাস থেকে যেন কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী সম্পূর্ণ সার পান, সেজন্য চরের অতিরিক্ত চাষাবাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।”

