নতুন নিলামবর্ষের শুরুতেই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের চায়ের বাজার। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিলামের পাশাপাশি পাইকারি পর্যায়ে চায়ের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশের খুচরা বাজারেও দাম বেড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে অতিরিক্ত চাপ ফেলছে।
জানা গেছে, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই বিপণনকারী কোম্পানিগুলো প্রতি কেজি চায়ের দাম ২০ টাকা বাড়িয়েছিল। সর্বশেষ গত শুক্রবার থেকে নতুন করে আরও ১০ টাকা বাড়িয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। বছরের প্রথমার্ধে চা উৎপাদনের মূল মৌসুম শুরু হলে নিলাম বাজারকে কেন্দ্র করে কয়েক দফায় ২০-৩০ টাকা দাম বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে চলতি বছর দেশে সাধারণ ব্লেন্ড চায়ের দাম কেজিপ্রতি অন্তত ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের শেষার্ধেও চায়ের দাম কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বর্তমানে দেশের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চা ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।
নিলাম কেন্দ্রগুলোতে গড়ে সর্বোচ্চ দাম ও বিক্রির চিত্র
চলতি বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২২ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত সময়ে দেশের তিনটি প্রধান নিলাম কেন্দ্রে চায়ের বেচাকেনা ও গড় মূল্য ছিল বেশ চাঙ্গা:
চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্র: ২৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি নিলামে ২ কোটি ৫৪ লাখ ৫১ হাজার ১৩৬ কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৭২ টাকা ৯২ পয়সা।
শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্র: ২২ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১২টি নিলামে ৫ লাখ ৫ হাজার ৩২ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। এখানে গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৬৩ টাকা ৩০ পয়সা।
পঞ্চগড় নিলাম কেন্দ্র: ১৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সাতটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৮৭ ৩৭ কেজি চা, যার গড় মূল্য ছিল ২৩৯ টাকা ৫৪ পয়সা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চায়ের দাম বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্রের সার্বিক গড় মূল্য কেজিপ্রতি ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে নিলামে চায়ের গড় মূল্য ছিল ১৯৬ টাকা ৫৮ পয়সা, যা ২০২৪ সালে প্রথমবার সর্বনিম্ন মূল্যস্তর (ফ্লোর প্রাইস) নির্ধারণের পর বেড়ে ২০২ টাকা ৪৬ পয়সায় দাঁড়ায়। পরের মৌসুমে মূল্যস্তর আবারও বাড়ানো হলে গড় মূল্য বেড়ে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সা হয়।
কেন বাড়ছে চায়ের দাম?
দেশের ১৭২টি চা বাগান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে চা উৎপাদনে জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন খরচ (Cost of Production – COP) মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেলেও নিলামে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছিল না। এতে অনেক বাগান লোকসানে পড়ে শ্রমিকদের মজুরি ও ঋণ পরিশোধে অসমর্থ হয়ে পড়ে।
এই সংকট কাটাতে ২০২৪ সালের মার্চে প্রথম এবং ২০২৫ সালের মে মাসে দ্বিতীয় দফায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে নিলামে চায়ের ৮টি গ্রেডের লিকার রেটিং অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল্যস্তর কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
চলতি বছরও লিকার রেটিং অনুযায়ী নতুন ন্যূনতম মূল্যস্তর নির্ধারণে গত ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে চা বোর্ড, বাংলাদেশ টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশীয় চা সংসদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শিগগিরই নতুন মূল্যস্তর সংশোধনের এই খবরে বড় ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো নিলাম থেকে আগাম ও আগ্রাসীভাবে চা সংগ্রহ করা শুরু করেছে। সাধারণত ভরা মৌসুমে নিলামে ৬৫-৭৫ শতাংশ চা বিক্রি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ৯৫-৯৮ শতাংশ চা একাই কিনে নিচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা, যা দাম বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রাখছে।
এক নজরে চায়ের বর্তমান বাজার ও পাইকারি দর:
| ব্র্যান্ড ও জাতের নাম | মোড়কের ওজন | পাইকারি/নির্ধারিত মূল্য |
| সিলন এফবি (Ceylon FB) | ৫০০ গ্রাম | ২৮০ টাকা (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) |
| সিলন পিডি / বিওপি / আরডি | ৫০০ গ্রাম | ২৪১ – ২৪৬ টাকা |
| ইস্পাহানি বেস্ট লিফ (Best Leaf) | ৫০০ গ্রাম | ২৩৫ টাকা (পাইকারি) |
| ইস্পাহানি মির্জাপুর বিওপি / পিডি | ৫০০ গ্রাম | ২১৫ – ২১৮ টাকা (পাইকারি) |
| চট্টলা ও অন্যান্য টি স্টল স্পেশাল | ৫০০ গ্রাম | ১৯০ – ২২৮ টাকা (পাইকারি) |
(উল্লেখ্য: খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি ৫০০ গ্রামের মোড়কে পাইকারি দামের চেয়ে আরও ৩০-৪০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।)
খাতসংশ্লিষ্ট ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর ইসলাম জানান, “জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরিসহ সার্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে ১ কেজি চা উৎপাদনে খরচ (COP) ২৭০ টাকার কম নয়। শিল্পকে বাঁচানো, কর্মসংস্থান রক্ষা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে নিলামে চায়ের ফ্লোর প্রাইস (Floor Price) সংশোধন করা জরুরি।”
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ ব্র্যান্ডেড চা কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং চা কেবল চা বোর্ডের মুষ্টিমেয় জনবলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় কৃত্রিমভাবে দাম বসাতে হচ্ছে। চাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় এনে অবাধ বাজারভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় রাখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি জানান, “বাগানগুলোর উৎপাদন খরচ উঠাতে না পারায় অংশীজনদের সাথে বৈঠক করে ধারাবাহিকভাবে ন্যূনতম মূল্যস্তর সংশোধন করা হচ্ছে। এবারও বৈঠকের তথ্যের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”

