Tuesday, 21 April, 2026

দিনাজপুরে আমের বাম্পার ফলনের হাতছানি: মুকুল ও গুটিতে ছেয়ে গেছে বাগান


আমের মুকুল ও গুটির পরিচর্যা

উত্তরের জেলা দিনাজপুরে প্রকৃতিতে এখন পাকা আমের আগাম বারতা। বসন্তের বিদায় আর গ্রীষ্মের আগমনে জেলার আম বাগানগুলোয় সবুজ পাতার ফাঁকে দৃশ্যমান হচ্ছে আমের কচি গুটি। মুকুল ও গুটির মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত জেলার সর্বত্র। বাম্পার ফলনের আশায় বাগান পরিচর্যায় এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষি ও বাগান মালিকরা।

লক্ষ্যমাত্রা ও চাষের পরিসংখ্যান

দিনাজপুর হটিকালচার বিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১০ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮৭৫ হেক্টর বেশি। গত বছর ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ফলন হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ মেট্রিক টন আম। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরো পড়ুন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও কমেছে আড়তে সবজির দাম
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বেড়ে কমেছে সবজির দাম, লোকসানে কৃষক

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে রাজশাহীর কৃষকদের কাছ থেকে সবজি কেনা কমানো শুরু Read more

পেঁয়াজের দামে হতাশা “এক মণ পেঁয়াজ তুলতে খরচ ১৫০০, বিক্রি ৮০০ টাকায়”
পাবনার ‘পেঁয়াজের ভান্ডারে’ ভালো ফলনেও কৃষকের লোকসান, প্রতি মণে ৫০০ টাকা দাম কম

ভালো ফলন কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের পেঁয়াজচাষি মোতাহার হোসেন ভালো ফলন পেয়েও খুশি নন। বরং Read more

নতুন জাত ও আধুনিক কৃষির প্রভাব

দিনাজপুর হটিকালচার বিভাগের উপপরিচালক মো. এজামুল হক জানান, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর আমের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় না। তিনি বলেন:

“নতুন প্রজাতির আমের চারা রোপণের এক বছরের মধ্যেই ফলন আসতে শুরু করেছে। ৫ বছর বয়সী গাছে যে পরিমাণ আম ধরছে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত কাটিমন, ব্যানানা ম্যাংগো, বারি-১, ২, ৩ ও ৪ জাতের আম চাষে বিপ্লব এসেছে দিনাজপুরে।”

নতুন এসব জাত কেবল সুস্বাদু ও মিষ্টিই নয়, বাজারে এর চাহিদাও ব্যাপক। প্রথাগত হাড়িভাঙ্গা, রুপালি, ল্যাংড়াফজলির পাশাপাশি এই নতুন জাতগুলো চাষিদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে।

লাভজনক আম বাগান: পাইকারদের ভিড়

দিনাজপুরের আমের গুণগত মান ও স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা আগাম বাগান কিনে নিচ্ছেন। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা পাইকার রহমত আলী ও শরিফুল ইসলাম জানান, তারা ৫টি বাগান ৩ বছরের জন্য ১৫ লক্ষ টাকায় কিনেছেন। গত এক বছরেই তাদের খরচ বাদে ১০ লক্ষ টাকা মুনাফা হয়েছে। আগামী দুই বছরে তারা বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভের আশা করছেন।

বিরল, বোচাগঞ্জ, কাহারোলসহ ১৩টি উপজেলাতেই এখন বাগান পরিচর্যার ধুম লেগেছে। রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের পাইকাররা এখন বাগানগুলোতে সেচ ও ভিটামিন স্প্রে প্রয়োগে ব্যস্ত।

বিদেশে রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা

দিনাজপুর জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, “গত বছর দিনাজপুর থেকে বিদেশে আম রপ্তানি করে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে। আমরা চাষিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বিদেশে আম রপ্তানির প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।”

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোছা. আরজেনা বেগম জানান, তারা বাগান মালিকদের পাশাপাশি বসতবাড়ির আম গাছের যত্নেও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।

মাঠপর্যায়ের চিত্র

জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের চাষি জিয়াব উদ্দিন জানান, তার ৫ একরের বাগানে ল্যাংড়ানাগ ফজলির ব্যাপক মুকুল এসেছে। অন্যদিকে হাকিমপুরের খলিলুর রহমান আশা করছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে বাড়ির আঙিনার গাছেও মিলবে আশাতীত ফলন।

জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ—পুরো সময়টা দিনাজপুর জেলা আম সরবরাহে মুখরিত থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

0 comments on “দিনাজপুরে আমের বাম্পার ফলনের হাতছানি: মুকুল ও গুটিতে ছেয়ে গেছে বাগান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ