Wednesday, 24 June, 2026

ডিমলায় মহামারি আকারে ছড়াচ্ছে গরুর ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’: এক মাসে ৮০ গরুর মৃত্যু


গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় গবাদিপশুর মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি) ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই রোগে গত মাত্র এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭০ থেকে ৮০টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত গরুর সংখ্যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকায় সাধারণ কৃষক ও খামারিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঘরে ঘরে আক্রান্ত গরু, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পশ্চিম ছাতনাইয়ে

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এছাড়া গয়াবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, পূর্ব ছাতনাই, বালাপাড়া, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি, নাউতারা ও ডিমলা সদর ইউনিয়নেও রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বা খামারে আক্রান্ত গরু রয়েছে। কোথাও কোথাও একই খামারের একাধিক গরু আক্রান্ত হওয়ায় খামারিরা সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছেন।

আরো পড়ুন
সস্তা সিন্থেটিক ফাইবারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপে বাংলাদেশের পাটপণ্য: বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী
সস্তা সিন্থেটিক ফাইবারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপে বাংলাদেশের পাটপণ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে স্বল্পমূল্যের সিন্থেটিক ফাইবারের বিশ্বব্যাপী সহজলভ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বাংলাদেশের পাটপণ্যের জন্য একটি বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। এটি Read more

ক্ষতিকর জাল উৎপাদন বন্ধের কঠোর নির্দেশ মৎস্য প্রতিমন্ত্রীর: জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও বিশেষ কার্ডের ঘোষণা
ক্ষতিকর জাল উৎপাদন বন্ধের কঠোর নির্দেশ মৎস্য প্রতিমন্ত্রীর

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সব ধরনের ক্ষতিকর জাল উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন মৎস্য ও Read more

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, ডিমলা উপজেলায় মোট গবাদিপশুর সংখ্যা প্রায় দুই লক্ষাধিক। তবে স্থানীয় খামারি ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে ইতোমধ্যে ২ হাজারেরও বেশি গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় রোগটি শনাক্ত হচ্ছে।

চিকিৎসার নামে খামারিদের পকেট কাটছেন গ্রাম্য চিকিৎসকরা

পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ গ্রামের সাদিয়া ডেইরি ফার্মের মালিক ছফিকুল ইসলাম বলেন:

“আমার ২২টি গরুর মধ্যে ৬টিই লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত। প্রতিদিন এদের চিকিৎসার পেছনে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। গরুগুলো বাঁচবে কিনা, তা নিয়ে আমরা গভীর আতঙ্কে আছি।”

একই গ্রামের দিনমজুর মোজাম্মেল হক জানান, তাঁর ৩টি গরুর মধ্যে ২টি আক্রান্ত। টাকার অভাবে তিনি ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। খগাখড়িবাড়ি এলাকার খামারি রুবেল ইসলাম জানান, তাঁর ২৩টি গরুর মধ্যে ৩টি আক্রান্ত হয়েছে।

খামারিদের অভিযোগ, উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এই সুযোগে কিছু হাতুড়ে ও গ্রাম্য পশুচিকিৎসক খামারিদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। বালাপাড়া এলাকার এক খামারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হাসপাতাল থেকে সব ওষুধ পাওয়া যায় না। গরু বাঁচাতে বাইরে থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে গিয়ে আমাদের পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।”

মাত্র ৪% গরুর ভ্যাকসিন আছে, ৯০% এরও বেশি ঝুঁকিতে

ডিমলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিদুল ইসলাম জানান, লাম্পি স্কিন রোগে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম হলেও আক্রান্ত গরু মারাত্মকভাবে দুর্বল ও ওজনে কমে যায়। তিনি বলেন:

“আমরা খামারিদের সরাসরি ও অনলাইনে পরামর্শ দিচ্ছি। আক্রান্ত গরুকে অবশ্যই মশারির ভেতর রাখতে হবে যাতে মশা-মাছির মাধ্যমে রোগটি অন্য গরুতে না ছড়ায়।”

ভ্যাকসিন সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি জানান, উপজেলায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৭ হাজার ৩৫৫ ডোজ এলএসডি ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে, যা মোট গবাদিপশুর মাত্র ৪ শতাংশের জন্য যথেষ্ট। ফলে উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি গবাদিপশু এখনও ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে এবং চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

এক নজরে ডিমলার এলএসডি পরিস্থিতি ও চিকিৎসকদের পরামর্শ:

বিষয়ের নামবর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়
মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুআক্রান্ত ২,০০০+ গরু, ১ মাসে মারা গেছে ৭০-৮০টি।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাপশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নসহ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন।
ভ্যাকসিনের ঘাটতি৯০%-এর বেশি গবাদিপশু এখনও ভ্যাকসিনের বাইরে।
প্রধান প্রতিরোধ ব্যবস্থাআক্রান্ত গরুকে মশারিতে রাখা এবং সুস্থ গরুকে দ্রুত ভ্যাকসিন দেওয়া।

মে থেকে জুলাই মাসে প্রাদুর্ভাব বেশি

প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. বায়েজিদ খন্দকার বলেন, সাধারণত মে থেকে জুলাই মাসে মাছি ও মশার উপদ্রব বাড়ায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। তারা নিয়মিত খামার পরিদর্শন ও উঠান বৈঠক করছেন। এই মুহূর্তে সুস্থ গরুকে ভ্যাকসিন দেওয়া এবং আক্রান্ত গরুকে সুস্থ গরু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

এদিকে পশুর হাটেও এই রোগের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্রেতারা এখন হাটে গরু কিনতে ভয় পাচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিমলার সর্বস্তরের কৃষক ও খামারিরা জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সরকারি ভ্যাকসিন সরবরাহ, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা প্রদানের জোর দাবি জানিয়েছেন।

0 comments on “ডিমলায় মহামারি আকারে ছড়াচ্ছে গরুর ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’: এক মাসে ৮০ গরুর মৃত্যু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ