বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি ও ঝামেলাহীনভাবে রপ্তানির লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে রপ্তানি প্রক্রিয়ার সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা একই ছাদের নিচে সম্পন্ন করতে রাজধানীর গাবতলীস্থ ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট’ (ভিএইচটি) সেন্টারে কাল (মঙ্গলবার) থেকেই চালু হচ্ছে বিশেষ কোয়ারেন্টাইন অফিস। এর ফলে রপ্তানিকারকেরা একই স্থানে পণ্য শোধন, আধুনিক প্যাকিং এবং কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট সম্পন্ন করে সরাসরি বিমানবন্দরে পাঠাতে পারবেন।
গতকাল সোমবার রাজধানীর গাবতলীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) স্থাপিত অত্যাধুনিক এই ভিএইচটি সেন্টারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এই তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ।
গাবতলী ভিএইচটি সেন্টারে মিলবে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’
উদ্বোধনকালে কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানির জটিলতা কমাতে আমরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (One-Stop Service) চালু করছি। কাল থেকেই এখানে পণ্য আসবে, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ওয়াশ হবে, আন্তর্জাতিক মানে প্যাকিং হবে এবং এখানেই কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষা সম্পন্ন করে সরাসরি বিমানবন্দরে পাঠানো যাবে।
রপ্তানিকৃত ফল যেন বিমানবন্দরে নষ্ট না হয়, সেজন্য সিভিল এভিয়েশনের সহায়তায় বিমানবন্দরে একটি বিশেষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণাগার (টেম্পারেচার কন্ট্রোলড স্টোরেজ) স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আম, কাঁঠালসহ দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক গুণগত মান শতভাগ অক্ষুণ্ন থাকবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী আমের ব্যাপক চাহিদা
রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। বাম্পার ফলন হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের প্রান্তিক কৃষকেরা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে রপ্তানি বাড়ানোই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও জানান:
চীন: বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল আমদানিতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন এবং পরীক্ষামূলকভাবে কিছু চালান ইতিমধ্যে নিয়েছে।
অন্যান্য দেশ: জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ (ইউএসএ) বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির আম আমদানিতে আগ্রহী।
“আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করতে হলে আমাদের বিশ্বমানের প্যাকিং ও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে, যা এই ভিএইচটি সেন্টারের মাধ্যমে সম্ভব হবে।” — কৃষিমন্ত্রী।
কমবে বিমানভাড়া, দেশজুড়ে বসছে ‘মিনি কোল্ড স্টোরেজ’
কৃষিপণ্য পরিবহনে বিমানভাড়া বা কার্গো খরচের বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন মন্ত্রী আমিন উর রশিদ। তিনি জানান, রপ্তানির খরচ কমিয়ে আনতে বিমান বাংলাদেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সঙ্গেও কার্গো সুবিধা বাড়ানো এবং আগাম কার্গো স্পেস (Cargo Space) সংরক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
শুধু আম নয়— লিচু, কাঁঠাল, বরই, টমেটো, পেঁপে ও মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই ভিএইচটি সেন্টারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এছাড়া, কৃষিপণ্য সংরক্ষণে সারা দেশে কয়েক হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের মেগা পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকের যেমন ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, তেমনি সারা বছর ভোক্তারাও স্থিতিশীল দামে পণ্য কিনতে পারবেন।
এক নজরে গাবতলী ভিএইচটি (VHT) সেন্টারের সেবাসমূহ:
| সেবার খাত | বিস্তারিত কার্যপ্রণালী |
| সার্ভিসের ধরন | সম্পূর্ণ ওয়ান-স্টপ সলিউশন (One-Stop Solution)। |
| প্রক্রিয়াজাতকরণ | অটোমেটিক ওয়াশ, ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট ও আন্তর্জাতিক প্যাকিং। |
| কোয়ারেন্টাইন সুবিধা | সেন্টারের ভেতরেই কাল থেকে সরাসরি সরকারি ছাড়পত্র প্রদান। |
| টার্গেট পণ্যসমূহ | আম, কাঁঠাল, লিচু, বরই, টমেটো, পেঁপে ও মিষ্টি আলু। |
রপ্তানিকারকদের প্রতি শতভাগ সততার আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে মন্ত্রী রপ্তানিকারকদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি ও পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি শতভাগ রক্ষা করতে হবে। পণ্যের মান নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ও ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করাই বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানির সব ধরনের নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দেবে উল্লেখ করে তিনি দেশের গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে ইতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।

