চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় প্রথমবারের মতো গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ করে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগে এই প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে অফ-সিজন বা গরমের দিনে পেঁয়াজের চাষ শুরু হয়েছে। পেঁয়াজ একটি উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল হওয়ায় এবং প্রথমবারেই বাম্পার ফলনের ইঙ্গিত মেলায় স্থানীয় চাষিদের মাঝে এটি চাষে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে।
৩ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল ‘নাসেক রেড’
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় এই গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ সম্প্রসারণে বিশেষ প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জাত ও জমির পরিমাণ: চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন ব্লকের প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল ও তাপ-সহনশীল ‘নাসেক রেড এন-৫৩’ জাতের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করা হয়েছে।
সরকারি প্রণোদনা: এই প্রকল্পের আওতায় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত মানের বীজ, সারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষি উপকরণ সহায়তা এবং নিবিড় কারিগরি তত্ত্বাবধান প্রদান করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
শীতের পর এবার গরমেও পেঁয়াজ: খুশি স্থানীয় কৃষকরা
সরেজমিনে হাইমচরের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, এখানকার উর্বর মাটি ও আবহাওয়া গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মাঠে মাঠে এখন পেঁয়াজের সবুজ ডগা ও চারা শোভা পাচ্ছে, যা কৃষকদের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে তাদের ধারণা ছিল পেঁয়াজ শুধু শীতকালেই চাষ করা সম্ভব। কিন্তু কৃষি বিভাগের সময়োপযোগী উৎসাহ ও সার্বিক সহায়তায় এবার তারা গরমের দিনেও সফলভাবে পেঁয়াজ চাষ করছেন। মাঠের বর্তমান অবস্থা দেখে তারা দারুণ আশাবাদী। ফলন ও বাজারমূল্য ভালো পাওয়া গেলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে এই পেঁয়াজের আবাদ করবেন বলে জানান তারা। তবে পেঁয়াজ চাষের এই ধারা বজায় রাখতে আগামী দিনেও সরকারি বীজ ও সার সহায়তা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
মাঠ পর্যায়ে চলছে নিবিড় কারিগরি প্রশিক্ষণ
হাইমচর উপজেলা কৃষি অফিসার শাকিল খন্দকার জানান, এই চাষ একদম নতুন হওয়ায় তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদারকি করছেন। তিনি বলেন:
“আমরা কৃষকদের শুধু বীজ বা সার দিয়েই দায়িত্ব শেষ করিনি; তাদের উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী কৃষি অফিসারগণ সার্বক্ষণিকভাবে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে থেকে রোগবালাই দমনে পরামর্শ দিচ্ছেন। হাইমচরের মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আশা করছি, আগামী দিনে এই উপজেলায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।”
এক নজরে হাইমচরের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ:
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রকল্পের নাম | কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প। |
| পেঁয়াজের জাত | উচ্চ ফলনশীল ‘নাসেক রেড এন-৫৩’। |
| মোট আবাদি জমি | প্রায় ৩ হেক্টর (পরীক্ষামূলক)। |
| সরকারি সুবিধা | বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও নিয়মিত মাঠ প্রশিক্ষণ। |
বাজার অস্থিরতা কমাবে এই উদ্যোগ
কৃষি সংশ্লিষ্ট ও বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দেয় এবং বাজারে চড়া মূল্যের অস্থিরতা তৈরি হয়। হাইমচরের এই সফল উদ্যোগ যদি দেশব্যাপী জেলাগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে অফ-সিজনে পেঁয়াজের ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে। এর ফলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে দেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।

