
বাংলাদেশের মৎস্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও বাজার সংযোগ বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো। আজ ময়মনসিংহে ‘ফুডটেকবাংলাদেশ’ (FoodTechBangladesh) প্রকল্পের আওতায় একটি বিশ্বমানের অ্যাকুয়াকালচার বা মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশীয় মৎস্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ফিসটেক (বিডি) লিমিটেড’-এর সার্বিক উদ্যোগে এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইতিমধ্যে নতুন এই গবেষণা কেন্দ্রে বাণিজ্যিকভাবে তেলাপিয়া চাষ শুরু হয়েছে। খুব শীঘ্রই এখানে চিংড়ি (গলদা ও বাগদা) চাষের বিশেষ গবেষণা ও আবাদ কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ফিসটেক (বিডি) লিমিটেডের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের টেকনিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার নাজমুল ইসলাম।
এক ছাদের নিচে আরএএস (RAS) প্রযুক্তি ও ল্যাব সুবিধা
গবেষণা কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (RAS) প্রযুক্তির সার্বিক সম্প্রসারণ, গবেষণা, ডেমোনস্ট্রেশন ও প্রশিক্ষণে ভূমিকা রাখবে।
নাজমুল ইসলাম জানান, কেন্দ্রটিতে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ট্যাঙ্ক আরএএস (Tank RAS) এবং পন্ড আরএএস (Pond RAS) প্রযুক্তি। এছাড়া মৎস্যচাষিদের সহায়তায় এতে রয়েছে:
রোগ নির্ণয় ল্যাবরেটরি (Disease Diagnosis Lab): মাছের রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের আধুনিক ব্যবস্থা।
পানি পরীক্ষা কেন্দ্র (Water Quality Testing Facility): পানির রাসায়নিক ও ভৌত মান নিয়ন্ত্রণের সুবিধা।
এর ফলে মৎস্য রোগ নির্ণয়, পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং সরাসরি বিশেষজ্ঞ পরামর্শের মতো সব সুবিধা এখন থেকে চাষিরা একই ছাদের নিচে পাবেন। পাশাপাশি প্রান্তিক চাষি, হ্যচারি মালিক, নতুন উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস যৌথ উদ্যোগ ও ‘ডাচ ডায়মন্ড অ্যাপ্রোচ’
‘ফুডটেক বাংলাদেশ’ মূলত বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের একটি যৌথ উদ্যোগ, যা বাংলাদেশে অবস্থিত ডাচ দূতাবাসের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ডাচ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান লারিভ ইন্টারন্যাশনাল (Larive International)-এর অধীনে এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে ছয়টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান— ফিসটেক (বিডি) লিমিটেড, ডি হিউস (De Heus), ভিকুয়া ওয়াটার সলিউশনস (Viqua Water Solutions), লাইট ক্যাসেল পার্টনার্স (LightCastle Partners) এবং জেমিনি সি ফুড (Gemini Sea Food)।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইয়োরিস ভ্যান বোমেল এই কেন্দ্রটিকে ‘ডাচ ডায়মন্ড অ্যাপ্রোচ’-এর এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যেখানে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে টেকসই উন্নয়নে কাজ করে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর একটি। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন চাষিরা। এই আধুনিক প্রযুক্তি তাঁদের সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহায্য করবে।”
এক নজরে গবেষণা কেন্দ্রের সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য:
| সুবিধাসমূহ | বিস্তারিত বিবরণ |
| মূল প্রযুক্তি | ট্যাঙ্ক আরএএস (Tank RAS) ও পন্ড আরএএস (Pond RAS)। |
| বর্তমান ও ভাবি ফসল | বর্তমানে তেলাপিয়া চাষ চালু, শীঘ্রই চিংড়ি আবাদ শুরু। |
| ল্যাব সুবিধা | রোগ নির্ণয় ল্যাব ও ওয়াটার কোয়ালিটি টেস্টিং সেন্টার। |
| প্রশিক্ষণ খাত | চাষি, হ্যাচারি মালিক, উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ সুবিধা। |
মৎস্য খাতের ৬০% অবদান এখন চাষের মাছের
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক বলেন, দুই থেকে তিন দশক আগেও দেশের মোট মাছ উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ আসত চাষের মাছ থেকে। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ সেই চিত্র বদলে গেছে; বর্তমানে মোট মাছ উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি আসছে অ্যাকুয়াকালচার বা চাষের মাধ্যম থেকে।
তিনি আরও যোগ করেন, “কমতে থাকা আবাদি জমিতে বেশি খাদ্য উৎপাদনের জন্য ‘আরএএস’ প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) মাধ্যমে এই আধুনিক প্রযুক্তি সাধারণ চাষিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারলে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের অগ্রযাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হবে।”
ফিসটেক (বিডি) লিমিটেডের সিনিয়র টেকনিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার ইমরান হোসেনও মনে করেন, সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের নীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’র সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।

