
পেঁপের মোজাইক ভাইরাস (Mosaic Virus) এবং পাতা কোঁকড়ানো (Leaf Curl Virus) রোগ দুটি পেঁপে চাষের সবচেয়ে বড় শত্রু। সরাসরি কোনো রাসায়নিক ওষুধ দিয়ে ভাইরাস সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করা যায় না; তবে এর বাহক পোকা (সাদা মাছি ও জাবপোকা) দমন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
১. বাহক পোকা দমনে রাসায়নিক ও কীটনাশক স্প্রে
ভাইরাস এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায় সাদা মাছি (Whitefly) এবং জাবপোকা (Aphids)-র মাধ্যমে। তাই চারা রোপণের পর থেকেই নিয়মিত নিচে উল্লেখিত স্পর্শক ও প্রবাহী কীটনাশক পর্যায়ক্রমে স্প্রে করতে হবে:
ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid 17.8 SL):
বাণিজ্যিক নাম: এডমায়ার, ইমিটাফ বা গেইন।
মাত্র: প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।
থায়ামেথোক্সাম + ল্যাম্বডা-সাইহ্যালোথ্রিন (Thiamethoxam + Lambda-cyhalothrin):
বাণিজ্যিক নাম: ভলিউম ফ্লেক্সি বা চক্রবর্ত্তী।
মাত্রা: প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ গ্রাম/মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
এসিফেট + ইমিডাক্লোপ্রিড (Acephate 50% + Imidacloprid 1.8% SP):
বাণিজ্যিক নাম: লান্সার গোল্ড।
মাত্রা: প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হয়।
মাকড়নাশক (যদি পাতা নিচের দিকে কোঁকড়ায়/লাল মাকড়ের আক্রমণ ঘটে):
আবামেকটিন (Abamectin) জাতীয় মাকড়নাশক (যেমন: ভার্টিমেক বা বায়োম্যাক্স) প্রতি লিটার পানিতে ১.২ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
বিশেষ পরামর্শ: কীটনাশক সবসময় বিকেলের দিকে স্প্রে করবেন এবং একই কীটনাশক বারবার ব্যবহার না করে প্রতি স্প্রেতে গ্রুপ পরিবর্তন করে দেবেন।
২. জৈব ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM)
হলুদ আঠালো ফাদ (Yellow Sticky Trap): বিঘাপ্রতি ৮-১০টি হলুদ আঠালো ফাঁদ বসাতে হবে। সাদা মাছি ও জাবপোকা এই হলুদ রঙের দিকে আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদে আটকে মারা যায়।
নিম তেল স্প্রে: প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি কাঁচা নিম তেল ও ১ গ্রাম ডিটারজেন্ট গুঁড়ো মিশিয়ে সপ্তাহে একবার স্প্রে করলে পোকার আক্রমণ কম হয়।
বীজতলা ঢেকে রাখা: চারার বয়সে রোগ সংক্রমণ বেশি হয়। তাই চারা তৈরির সময় মশারি বা নেট দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা উচিত।
৩. আক্রান্ত গাছের জরুরি পরিচর্যা
১. আক্রান্ত গাছ অপসারণ: জমিতে কোনো গাছে মোজাইক বা পাতা কোঁকড়ানো লক্ষণ দেখা মাত্রই গাছটি সাবধানে তুলে মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গাছ রেখে দিলে তা থেকে দ্রুত পুরো বাগান সংক্রমিত হবে।
২. গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি:
গাছকে শক্ত ও সতেজ রাখতে মোজাইক আক্রান্ত এলাকার আশপাশের গাছে জিঙ্ক (Zinc), বোরন (Boron) এবং অণুখাদ্য (Micronutrients) নিয়মিত অনুমেয় মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।
প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম সলুবর বোরন ও ২ গ্রাম চিলেটেড জিঙ্ক মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করা ভালো।
৩. আগাছা ও বিকল্প পোষক নিয়ন্ত্রণ: বাগানের ভেতরের ও আশপাশের সব আগাছা পরিষ্কার রাখতে হবে। পেঁপে বাগানের পাশে ধনে, মরিচ, বেগুন বা মিষ্টি কুমড়া জাতীয় ফসল চাষ করা থেকে বিরত থাকতে হবে (কারণ এগুলোতেও সাদা মাছির বিস্তার ঘটে)।

