Sunday, 05 July, 2026

লোকসানের বৃত্তে উত্তরবঙ্গের কৃষি: ধুঁকতে থাকা চাষিদের বাঁচিয়ে রেখেছে ‘সুপারি’র নীরব বিপ্লব


কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট বাজারে এক বস্তা সদ্য পাড়া সুপারি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৬০ বছর বয়সী কৃষক মোবারক হোসেন। তাঁর এই সুপারি বিক্রির পেছনের গল্পটি আসলে আজ পুরো উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির এক বাস্তব চিত্র।

মোবারক হোসেনের কাছে থাকা ৬ ‘পণ’ (১ পণ = ৮০টি সুপারি) সুপারির প্রতি পণ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা করে। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি ভালো ফলন ও চমৎকার আয় মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে চলতি বছর কৃষিতে এক নীরব বিপর্যয়ের গল্প।

আরো পড়ুন
মৎস্য চাষে নতুন বিপ্লব: বাকৃবি গবেষকদের উদ্ভাবনে ফিশমিলের বিকল্প দেশীয় ‘অণুশৈবাল’

বাংলাদেশের মৎস্য চাষের অন্যতম প্রধান ব্যয়বহুল উপাদান হলো মাছের খাবার বা অ্যাকোয়াফিড। বিশেষ করে ফিডে ব্যবহৃত আমিষের মূল উৎস ‘ফিশমিল’ Read more

বাকৃবি গবেষকদের ১৫ বছরের সাফল্য: নতুন রঙিন জাতের মুরগি উদ্ভাবন, মিলবে অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত নিরাপদ মাংস
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদের ১৫ বছরের গবেষণায় নতুন রঙিন জাতের মুরগি উদ্ভাবন। অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত নিরাপদ মাংস ও খামারিদের জন্য উচ্চ মুনাফার সুযোগ।

দীর্ঘ ১৫ বছরের নিরলস গবেষণার পর বাণিজ্যিকভাবে লালন-পালন উপযোগী একটি নতুন রঙিন গোশত উৎপাদনকারী মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি Read more

“বাড়ির চারপাশের এই সুপারি গাছগুলো না থাকলে আমরা এবার বড় বিপদে পড়ে যেতাম,” বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন মোবারক হোসেন।

চলতি মৌসুমে আলু এবং বোরো ধান চাষ করে তিনি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে সার, বীজ ও ডিজেলের দাম বাড়লেও বাজারে ভুট্টার দাম ছিল একেবারেই হতাশাজনক। এই চরম অর্থনৈতিক সংকটে বাড়ির আঙিনায় যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি গাছগুলোই এখন তাঁর পরিবার চালানোর প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

প্রথাগত ফসলে লোকসান, সুপারিতেই ভরসা

মোবারক হোসেনের এই অভিজ্ঞতা রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার হাজার হাজার কৃষকের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী প্রধান তিন ফসল— আলু, ধান ও ভুট্টা চাষ করে যখন খামারিরা খরচের টাকাই তুলতে পারছেন না, তখন কয়েক দশক আগে রোপণ করা সুপারি গাছের অবিরাম ফলনই গ্রামীণ পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রেখেছে।

একই বাজারে সুপারি বিক্রি করতে আসা ৬৫ বছর বয়সী প্রবীণ কৃষক ধনেশ্বর চন্দ্র বর্মন জানান, তাঁর ৭০টি সুপারি গাছ থেকে এবার ৮-৯ পণ সুপারি এসেছে। তিনি বলেন:

“গত বছরগুলোতে সুপারি বিক্রির টাকা দিয়ে আমি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতাম। কিন্তু এবার আলু আর ধান চাষে এত লস হয়েছে যে, সুপারি বিক্রির টাকা দিয়ে শুধু পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে হচ্ছে।”

নামমাত্র খরচ, দীর্ঘমেয়াদি লাভ: সুপারি চাষের সহজ অঙ্ক

সুপারির বাণিজ্যিক অংকটা অত্যন্ত সহজ ও লাভজনক। একটি সুপারি গাছ একবার বড় হয়ে গেলে তার পেছনে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায়। সামান্য জৈব সার আর প্রয়োজনমতো পানি দিলেই একটি গাছ টানা ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে যায়।

বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি পণ সুপারি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন খরচ প্রায় শূন্য হওয়ায় এই ফসলের পুরো আয়ই কৃষকের নিট মুনাফা।

কুড়িগ্রামের শামসুল আলম এর এক চমৎকার উদাহরণ। তিনি নিজের আট বিঘা জমিতে প্রায় ৩,০০০ সুপারি গাছের একটি বাগান গড়ে তুলেছেন। বছরে তাঁর বাগান রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয় মাত্র ২ লাখ টাকার কম, অথচ প্রতি বছর সুপারি বিক্রি থেকে তাঁর আয় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা!

গ্রামীণ উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণে সুপারি

সুপারি এখন আর শুধু পারিবারিক আয়ের উৎস নয়, এটি গ্রামীণ অবকাঠামো ও সামাজিক কল্যাণেও ভূমিকা রাখছে। লালমনিরহাটের লক্ষ্মীকান্ত বর্মন সরকারি রাস্তার পাশে প্রায় ৪০০টি সুপারি গাছ লাগিয়েছেন। এই গাছগুলো থেকে প্রতি বছর যে লাখ লাখ টাকা আয় হয়, তা দিয়ে স্থানীয় সামাজিক কল্যাণ ও ধর্মীয় কার্যক্রমের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। এছাড়া তাঁর বাড়ির আঙিনার ১২০টি গাছ নিজের চাহিদা মিটিয়ে পরিবারকে বাড়তি আর্থিক জোগান দিচ্ছে।

লক্ষ্মীকান্ত বর্মন বলেন, “সুপারি চাষ এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি কেবল আয়ের উৎসই নয়, গ্রামগুলোকে সুন্দর রাখে এবং মাটির ক্ষয় রোধেও সাহায্য করে।”

এক নজরে উত্তরবঙ্গের সুপারি অর্থনীতি:

বিষয়ের নামপরিসংখ্যান ও তথ্য
মোট সুপারি গাছের সংখ্যাপ্রায় ৫৫ লাখ (রংপুর অঞ্চল)।
বাণিজ্যিক বাগানপ্রায় ১,৬০০টি (৪ থেকে ২০ বিঘা আয়তনের)।
বার্ষিক উৎপাদন৩০০ কোটিরও বেশি সুপারি।
বাজারমূল্য (প্রতি পণ)৩০০ থেকে ৬০০ টাকা (১ পণ = ৮০টি)।
মূল সুবিধাশূন্য উৎপাদন খরচ, ৩৫-৪০ বছর একটানা ফলন।

কোটি টাকার পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণ পদ্ধতি

রংপুর সিটি মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম জানান, এই অঞ্চলে তাঁর মতো শতাধিক বড় আড়তদার রয়েছেন এবং তাঁর নিজেরই বার্ষিক টার্নওভার (লেনদেন) ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পাইকাররা প্রতি বছর এপ্রিল থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচা সুপারি সংগ্রহ করেন। এরপর এই সুপারিগুলো মাটির নিচে গর্ত করে বিশেষ পদ্ধতিতে (মজে যাওয়া সুপারি বা ‘মজা সুপারি’) সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সুপারি চাষের এই বাণিজ্যিক রূপান্তর সম্পর্কে বলেন:

“একসময় সুপারি চাষকে কেবল শখের বশে বাড়ির আঙিনায় লাগানো হতো, কিন্তু এখন এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের জলবায়ু ও মাটি সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, একারণেই প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এই গাছ দেখা যায়।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সুপারি শুধু মানুষের মুখই লাল করে না, এটি আজ কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, সন্তানদের শিক্ষার খরচ জোগাচ্ছে এবং নীরবে লাখ লাখ গ্রামীণ পরিবারকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করছে।”

0 comments on “লোকসানের বৃত্তে উত্তরবঙ্গের কৃষি: ধুঁকতে থাকা চাষিদের বাঁচিয়ে রেখেছে ‘সুপারি’র নীরব বিপ্লব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ