
দীর্ঘ ১৫ বছরের নিরলস গবেষণার পর বাণিজ্যিকভাবে লালন-পালন উপযোগী একটি নতুন রঙিন গোশত উৎপাদনকারী মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকরা। সম্পূর্ণ দেশীয় আবহাওয়া উপযোগী এই মুরগি একদিকে খামারিদের বিপুল অর্থনৈতিক মুনাফা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের দেবে শতভাগ নিরাপদ ও অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত মাংসের নিশ্চয়তা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: বজলুর রহমান মোল্যার নেতৃত্বে একদল গবেষক এই নতুন জাতের মুরগি উদ্ভাবন করেছেন। গবেষণা প্রকল্পটি সরকারের ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প’ (এলডিডিপি)-এর অর্থায়নে পরিচালিত হয়। গত মঙ্গলবার পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো: শওকত আলীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
গবেষণার নেপথ্যে ও প্রযুক্তিগত সাফল্য
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো: বজলুর রহমান মোল্যা জানান, দেশের সাধারণ ভোক্তার চাহিদা এবং প্রান্তিক খামারিদের বাণিজ্যিক লাভের কথা মাথায় রেখেই বিভিন্ন প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ, নির্বাচন ও সঙ্করায়ণের মাধ্যমে এই নতুন জাতটির উন্নয়ন করা হয়েছে।
গবেষণার কিছু উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত দিক নিচে দেওয়া হলো:
স্থায়ী জাত হিসেবে স্বীকৃতি: এই গবেষণায় ‘সেক্স-লিংক হোয়াইট লাইন’কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর সমজাতীয়তা বা হোমোজাইগোসিটি ৮৯ থেকে ৯৩.১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা একটি স্থায়ী জাত হিসেবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
জেনেটিক উদ্ভাবন: মুরগির পালকের রং নির্ধারণকারী ‘এসওএক্স-১০’ (SOX-10) জিনের ডিলিশন শনাক্তে একটি সহজ পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা, যা ভবিষ্যৎ প্রজনন কর্মসূচিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ওজনে চমক ও খামারিদের বাড়তি মুনাফা
নতুন উদ্ভাবিত এই মুরগি প্রচলিত সোনালি বা অন্যান্য জাতের চেয়ে উৎপাদনশীলতায় অনেক এগিয়ে। একদিনের বাচ্চার ওজনেই এর বড় প্রমাণ মেলে।
| বৈশিষ্ট্য / প্যারামিটার | প্রচলিত সোনালি মুরগি | নতুন উদ্ভাবিত জাত |
| একদিনের বাচ্চার ওজন | ২৬ থেকে ২৮ গ্রাম | প্রায় ৩৮ গ্রাম |
| ডিম উৎপাদন ক্ষমতা | তুলনামূলক কম | ৬২ সপ্তাহে প্রায় ২০৫টি (প্যারেন্ট লাইন) |
| চূড়ান্ত বাজার ওজন (বাজারজাতকরণে) | সাধারণ মান | প্রতি ১ গ্রাম শুরুর ওজনের বিপরীতে ৫০ গ্রাম অতিরিক্ত মাংস |
ড. মোল্যা জানান, একদিনের বাচ্চার ওজনে প্রতি ১ গ্রাম বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব বাজারজাতকরণের সময় প্রায় ৫০ গ্রাম অতিরিক্ত চূড়ান্ত ওজনে প্রতিফলিত হয়। ফলে খামারিরা খুব অল্প সময়েই বেশি মাংস পাবেন।
সরাসরি মাঠে প্রযুক্তি হস্তান্তর: স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারী খামারিরা
এই গবেষণা প্রকল্পের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর। কোনো প্রথাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের চার দেয়ালে বন্দি না থেকে গবেষক দলটি সরাসরি গ্রামে গিয়ে ১৫ থেকে ২৫ জনের ক্লাস্টারভিত্তিক নারী খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের ফলাফলে দেখা গেছে, যেসব খামারিকে বাচ্চার পাশাপাশি নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, সঠিক সময়ে টিকা প্রদান এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে, তাদের খামারে মুরগির মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে এবং খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা (FCR) উন্নত হয়েছে। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় অনেক খামারি নির্ধারিত ৫০ দিনের পরিবর্তে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত এই মুরগি পালন করছেন এবং প্রতি কেজি ৭০০ টাকা পর্যন্ত উচ্চমূল্যে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।
দেশি মুরগির নামে প্রতারণা নয়, তৈরি হবে নিজস্ব ব্র্যান্ড
ভোক্তা অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন ড. বজলুর রহমান। ঢাকার একটি উন্নত গবেষণাগারে এই মুরগির মাংস পরীক্ষা করে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ (Antibiotic Residue) পাওয়া যায়নি।
বাজারে দেশি মুরগির নামে চালিয়ে ক্রেতা প্রতারণার কোনো সুযোগ থাকবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য দেশি মুরগির নাম ভাঙানো নয়। বরং চমৎকার স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও শতভাগ নিরাপদ মাংসের নিশ্চয়তা দিয়ে এটিকে বাজারে একটি স্বতন্ত্র ‘রঙিন গোশতের ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
ল্যাবের প্রযুক্তি খামারিদের দোরগোড়ায়
উদ্ভাবনটির মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়ে বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন:
“শুধু ল্যাবরেটরিতে জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না, সেই প্রযুক্তি ও সুফল সাধারণ খামারিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল দর্শন। এর মাধ্যমে আমাদের প্রান্তিক খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন এবং দেশের নিরাপদ প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণ সহজ হবে।”
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা এই জাতটিকে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের আহ্বান জানান।

