
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় পুরোদমে শুরু হবে বোরো ধান কাটা। হাওরজুড়ে এখন সেই প্রস্তুতি। কিন্তু যেসব কৃষক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ এনে চাষ করেছিলেন, তাঁদের মনে নেই কোনো খুশি। বরং দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তারা।
কারণ, এই জাতের ধান যাঁরা চাষ করেছেন, তাঁদের জমিতে এক জাতের ধান হয়নি। দেখা যাচ্ছে নানা জাতের ধান। একই গোছায় কয়েক জাতের ধানের মধ্যে কোনোটা পেকে গেছে, কোনোটা আধাপাকা, আবার কোনোটার শিষই বের হয়নি। কীভাবে এসব ধান কাটবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না কৃষকেরা। পাকা ধান কাটার চেষ্টা করলে নষ্ট হবে আধাপাকা ধান। আবার আধাপাকার জন্য অপেক্ষা করলে ঝরে যাবে পাকাগুলো।
কোন উপজেলায় সমস্যা বেশি?
জেলার করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে এ অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক চিত্র করিমগঞ্জ ও ইটনা উপজেলার হাওরে। কৃষকেরা সরাসরি বিএডিসির সরবরাহ করা বীজে মিশ্রণের অভিযোগ এনে কাঁদছেন।
কৃষকের বক্তব্য (স্থানীয় ভাষায়)
হাবিবুর রহমান (৫০), মদন গ্রাম, গুণধর ইউনিয়ন:
“১৩ কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমিত বিএডিসির ৮৮ ধান করছিলাম। ধানতো শুরুতে চিনন যায় না। অহন আমার খেতো অর্ধেকেও ৮৮ ধান নাই। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শিষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম? কোনডা কাডবাম? পাকনাডা কাটলে কাচাডা কাডন যাইতো না। ধারকর্জ কইরা চাষ করছি। কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান অইলোইলে। অহন ১০০ মণ ফাইয়াম কি না সন্দেহ। অহন আমার এ ক্ষতিপূরণ কেলা দিব।”
ওমর সিদ্দিক (৪০), খয়রত গ্রাম: তিনি ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী খেত (সিড ভিলেজ প্রদর্শনী)। ‘ফ্লাড রিকন্সট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্টেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)’–এর আওতায় তাঁকে এ প্রদর্শনী করতে দেয়া হয়। বীজ সরবরাহ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এখানেও একই অবস্থা। খেতে শুধু ব্রি-ধান ৮৮–এর জায়গায় বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। অর্ধেক ধানও বাড়িতে নিতে পারবেন কি না, সন্দেহে আছেন তিনি।
একই অভিযোগ করিমগঞ্জের বড়হাওরের কৃষক আক্তার মিয়া (৬৫) ও জমির উদ্দিনের (৫৫) । তাঁদের আশঙ্কা, যাঁরা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবারই ক্ষতি হবে। বিশেষ করে যাঁরা ঋণ করে চাষ করেছেন, তাঁরা পথে বসবেন।
ক্ষতির পরিমাণ কত? (কৃষি কর্মকর্তাদের ধারণা)
জেলার হাওর উপজেলাগুলোর মাঠপর্যায়ের অন্তত ২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, প্রায় ১০ হাজার হেক্টর ধানখেতে এ রকম অস্বাভাবিক অবস্থা হয়েছে। মোটকথা, যাঁরাই বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮–এর বীজের চারা রোপণ করেছেন, তাঁদের সবার খেতে কমবেশি একই অবস্থা।
কোথায় থেকে কেনা হয়েছিল বীজ?
কৃষকদের ভাষ্য, তাঁরা ধানের বীজ কিনেছিলেন বিএডিসির অনুমোদিত স্থানীয় ডিলার ও সাবডিলারদের কাছ থেকে। বিএডিসির ৮৮ জাতের বীজে ছিল নানা জাতের ধানের মিশ্রণ। এক গোছাতেই তিন-চার ধরনের ধান হয়েছে। পাকাও একেক সময়ে। খেতের এই অস্বাভাবিক চিত্র দেখে দিশেহারা কৃষক কৃষি ও বীজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।
সরকারি তথ্য
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার পুরো জেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে। করিমগঞ্জ, ইটনাসহ বেশ কিছু হাওরে এ জাতের অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে।
কৃষি বিভাগের অবস্থান
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, তিনি মাঠপর্যায়ে সমস্যাটি শুনে কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছেন। তাঁরাও ব্রি-ধান ৮৮–এর বীজে মিশ্রণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। ওই সব জমিতে কিছু ধান পেকে গেছে, কিছু আধাপাকা, কিছু কাঁচা, আবার কোনো কোনো জমিতে শিষই বের হয়নি। এতে ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও কৃষকের তালিকা করা হচ্ছে। বিএডিসিকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিএডিসির ব্যাখ্যা ও প্রতিশ্রুতি
বিএডিসি (বীজ বিপণন) জানিয়েছে, বোরো মৌসুমে তারা প্রায় ৩৭০ টন ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করেছে। পরে আরও ৩১৮ টন দেয়া হয়। বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর কোথায় সমস্যা হয়েছে, তদন্ত চলছে।
বিএডিসির উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদ দাবি করেন, ন্যাচারাল মিউটেশন বা সেচ-সার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি কিংবা বীজের উৎসে ত্রুটির কারণেও এমন হতে পারে।
বিএডিসির উপপরিচালক (বীজ বিপণন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমরাও মাঠপর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কোনো ডিলার যদি নকল বীজ দিয়ে থাকে, আমরা ব্যবস্থা নেব। আর আমাদের নিজস্ব উৎস থেকে এলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শুরু করেছি।”
বর্তমান অবস্থা ও আশঙ্কা
ইতিমধ্যে পাকা ধান ঝরে যাওয়া শুরু হয়েছে। অন্যদিকে আধাপাকা ও কাঁচা ধান রেখে দিলে পাকাগুলো আরও নষ্ট হবে। বৃষ্টি ও আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে কৃষকেরা এক অনিশ্চিত ফসলের দিকে তাকিয়ে আছেন। আগামী সপ্তাহেই ধান কাটা শুরু হবে—কিন্তু কীভাবে কাটবেন, তা নিয়েই চলছে চরম দুশ্চিন্তা।

