
ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানিকৃত তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে দেশে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। রবিবার কার্যকর হওয়া এই নতুন দামে গণপরিবহন, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বাধিক ব্যবহৃত ডিজেলের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটার ১৩৫ টাকায়।
হঠাৎ ডিজেলের এমন অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে দেশের কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে রোপা আমন চাষ ও আসন্ন বোরো মৌসুমের প্রস্তুতি চরম অনিশ্চয়তা ও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
আমন ও বোরো মৌসুমে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা
বর্তমানে কৃষক যখন আমন ধান পরিচর্যা করছেন এবং আগামী নভেম্বর থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই খাদ্যশস্য কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই তেলের দাম বাড়ানো হলো। এর ফলে ডিজেলচালিত কম্বাইন হারভেস্টার ও থ্রেশার মেশিন পরিচালনায় খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে।
এছাড়া সামনেই আসছে বোরো মৌসুম, যা দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ যোগান দেয়। এই মৌসুমে জমি চাষ, রোপণ, সেচ এবং ধান মাড়াইয়ের প্রতিটি ধাপই পুরোপুরি যন্ত্রভিত্তিক।
এক নজরে কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার ও চাহিদা:
কৃষি যন্ত্রপাতির সংখ্যা: বাংলাদেশে বর্তমানে ২১ লাখের বেশি কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে।
ডিজেলচালিত পাম্প ও টিলার: ৩.৮ লাখ পাওয়ার টিলার এবং ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচ পাম্প মূলত শুষ্ক মৌসুমের বোরো চাষে ব্যবহৃত হয়।
বার্ষিক ডিজেল খরচ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, কৃষি খাতে প্রতি বছর প্রায় ১২.৫৫ লাখ টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যা দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ১৫ শতাংশের বেশি।
ধানের কম দামের মধ্যে বাড়তি খরচের চাপ, কৃষকদের হাহাকার
একদিকে চালের খুচরা মূল্য তুলনামূলক কম, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন দেশের প্রান্তিক চাষিরা। সরকারি সংস্থা টিসিবি-র (TCB) তথ্যমতে, ঢাকার বাজারে মোটা চাল বর্তমানে প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ৫৫-৬০ টাকা।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কৃষক বাবলু মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“ডিজেলের দাম বাড়ার আসল ধাক্কা আমাদেরই সইতে হবে। সেচ আর চাষের খরচ একধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে। অথচ গত দুই মৌসুম ধরে ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে লোকসান গুনছি। এভাবে চলতে থাকলে অনেকে চাষাবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে।”
অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রংপুর ও লালমনিরহাটের কৃষকরাও। তাদের মতে, ডিজেল ছাড়া আধুনিক কৃষির কথা চিন্তা করা অসম্ভব। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সেচ ও যন্ত্রপাতির ভাড়া সরাসরি বেড়ে যাবে, যা কৃষকের জীবনজীবিকায় বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞদের তাগিদ
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লে তা সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে এবং দেশের চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন: “বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের এই বাড়তি খরচের অভিঘাত থেকে বাঁচাতে সরকারি প্রণোদনা ও সরাসরি ভর্তুকি প্রদান জরুরি। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে অনেক কৃষক তা বহন করতে পারবেন না, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।”
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রস্তম আলী জানান: “উৎপাদন খরচের ওপর কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, আবার তারা পণ্যের দামও পান কম। তেলের দাম বাড়ায় কৃষক হয়তো অন্য উপকরণের খরচ কমাতে বাধ্য হবেন, যা শেষ পর্যন্ত মোট কৃষি উৎপাদনশীলতা ও গ্রামীণ পরিবারের আয় কমাবে।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতিবিদরা কৃষকদের সরাসরি নগদ সহায়তা এবং কৃষি কাজে ব্যবহৃত ডিজেলে বিশেষ ভতুর্কি দেওয়ার জোর সুপারিশ করেছেন।

