
দেশের উত্তরাঞ্চলসহ প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে বইছে বাম্পার ফলনের আনন্দ, কিন্তু সেই আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে বাজারের ভয়াবহ দরপতনে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো লোকসানের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক আলু চাষিরা। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে, তা উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম।
খরচ ১৬ টাকা, বিক্রি ৮ টাকায়! কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) তথ্যমতে, এ বছর উন্নত জাতের আলু (অ্যাস্টেরিক্স, ডায়মন্ড ও গ্র্যানোলা) উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৬.৬৪ টাকা। অথচ গত এক মাস ধরে মাঠ পর্যায়ে এই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা কেজিতে। অর্থাৎ প্রতি কেজি আলু বিক্রিতে কৃষকের পকেট থেকে যাচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকা।

তুলনামূলক বাজার চিত্র: গত বছর বনাম বর্তমান
| বিবরণ | গত বছর (এই সময়ে) | বর্তমান অবস্থা (২০২৬) |
| মাঠ পর্যায়ে দাম (প্রতি মণ) | ৫০০ – ৫৫০ টাকা | ৩০০ – ৩৫০ টাকা |
| মাঠ পর্যায়ে দাম (প্রতি কেজি) | ১৩ – ১৫ টাকা | ৮ – ১০ টাকা |
| উৎপাদন খরচ (প্রতি কেজি) | – | ১৬.৬৪ টাকা |
কেন এই দরপতন? বিশেষজ্ঞ ও কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. উদ্বৃত্ত উৎপাদন: দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৯০ লাখ টন হলেও গত বছর উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড ১.১৫ কোটি টন। এই বিপুল উদ্বৃত্ত আলু সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
২. রপ্তানিতে ব্যর্থতা: গত ৫ বছরে আলু রপ্তানি ৬২ হাজার টনের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং উচ্চ পরিবহন খরচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. আড়তদার ও সিন্ডিকেট: মাঠ পর্যায়ে দাম কমলেও খুচরা বাজারে সাধারণ মানুষ এখনো ১৩-১৪ টাকা কেজিতে আলু কিনছে, যার সুবিধা পাচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
কৃষকের হাহাকার: ঋণের বোঝা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা মুন্সিগঞ্জের পঞ্চসারের কৃষক আনোয়ার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “গত বছর বড় লোকসান খেয়ে এবার ১৫ বিঘা থেকে কমিয়ে মাত্র ৪ বিঘায় আলু করেছি। কিন্তু এবারও যে দাম, তাতে ঋণের টাকা শোধ করা তো দূরের কথা, জমি চাষের খরচও উঠবে না।”
একই অবস্থা উত্তরের জেলা জয়পুরহাট ও লালমনিরহাটেও। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করা অনেক কৃষক এখন পাওনাদারদের ভয়ে এলাকা ছাড়ার উপক্রম হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: > কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “আলু চাষিদের বাঁচাতে হলে ধানের মতো সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ শুরু করতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে সারা বছর আলু বিক্রি করলে এবং বিদেশে দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে নতুন বাজার ধরলে এই সংকট কাটানো সম্ভব।”
অনুকূল আবহাওয়া ও পোকার উপদ্রব কম থাকায় ফলন ভালো হলেও, রপ্তানি ও সংরক্ষণের অভাবে কৃষকের ‘সাদা সোনা’ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

