Tuesday, 28 July, 2026

কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ স্কিম


বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার: ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন স্কিম গঠন। কৃষকেরা কম সুদে ঋণ পাবেন। ১০ লাখ পর্যন্ত জামানতবিহীন কৃষিঋণ।

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ জনপদে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল পুনঃ অর্থায়ন স্কিম (Refinancing Scheme) গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত পাঁচ বছর মেয়াদি এই স্কিমের আওতায় কৃষকেরা অত্যন্ত কম সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন।

গতকাল রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত পরিপত্র জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

কারা পাবেন এই সহজ শর্তের ঋণ?

আরো পড়ুন
কৃষকের স্বস্তি দুই সপ্তাহে দ্বিগুণ পেঁয়াজের দাম
দেশের পাইকারি বাজারে দ্বিগুণ বাড়লো পেঁয়াজের দাম। পচন ও সংরক্ষণাগারের অভাবে সরবরাহ কমায় স্বস্তিতে চাষি, তবে খুচরায় ৫০-৬০ টাকা কেজিতে বিপাকে ভোক্তা।

গত কয়েক মাস ধরে দেশের প্রধান প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে অব্যাহত দরপতন ও ক্রমাগত লোকসানের বোঝা টানছিলেন কৃষকেরা। তবে গত Read more

চা শিল্পের উন্নয়নে সরকারের বড় ঘোষণা: ব্যাংক ঋণের বোঝা লাঘব, কম সুদে ঋণ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাতের দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস Read more

প্রকৃত চাষি ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এই ঋণ দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও নারী কৃষকেরা ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করতে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বা সরকারের ‘কৃষক কার্ডের’ তথ্য ব্যবহার করা হবে।

বিশেষ সুবিধাসমূহ:

  • জামানতবিহীন ঋণ: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা এককভাবে জামানত ছাড়াই শুধু শস্য-ফসলের দায়বদ্ধতার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।

  • সামাজিক জামানত: নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলগত সামাজিক জামানত বিবেচনা করা হবে।

  • ঋণের ব্যবহার: একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ তিনবার এই স্কিমের সুবিধা নিতে পারবেন। তবে, এই ঋণ কোনোভাবেই পুরোনো ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

  • ঋণখেলাপিরা অযোগ্য: কোনো কৃষক বা গ্রাহক যদি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি হয়ে থাকেন, তবে তিনি এই স্কিমের আওতায় ঋণ পাবেন না।

খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ঋণের সীমা:

কৃষি ও পল্লি খাতের প্রায় সব বড় শাখাতেই এই ঋণ দেওয়া হবে। একজন গ্রাহকের জন্য খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে:

খাতের নামসর্বোচ্চ ঋণের সীমা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত১ কোটি টাকা পর্যন্ত
শস্য ও ফসল খাত৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত (সর্বোচ্চ ৫ একর জমিতে চাষাবাদের জন্য ফসল দায়বদ্ধতার বিপরীতে)
কৃষি যন্ত্রপাতি খাত২০ লাখ টাকা পর্যন্ত
আয় উৎসারী কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য পল্লি ঋণ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত

সুদের হার: কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ

গ্রাহক বা কৃষক পর্যায়ে এই ঋণের সুদের হার অত্যন্ত সাশ্রয়ী। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও মুনাফার হার কোনোভাবেই এর বেশি হতে পারবে না।

  • গ্রাহক পর্যায়ে সুদ: সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ (সরল সুদে)।

  • তহবিল খরচ: বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে এই তহবিল বা পুনঃ অর্থায়নের সুবিধা পাবে।

কঠোর তদারকি ও জরিমানা: যদি কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ৮ শতাংশের চেয়ে বেশি সুদ আদায় করে কিংবা তহবিলের অপব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ জরিমানা আরোপ করে এককালীন টাকা আদায় করে নেবে।

বরাদ্দ ও ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব

  • মোট বরাদ্দ: এই স্কিমের মোট আকার ১০ হাজার কোটি টাকা। এটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য তহবিল, অর্থাৎ আদায় হওয়া টাকা আবার ঋণ হিসেবে বিতরণ করা যাবে।

  • তহবিল বণ্টন: ব্যাংকগুলোর চাহিদা ও বার্ষিক কৃষিঋণ বিতরণের সক্ষমতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিল বরাদ্দ দেবে। ঋণ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ‘অংশগ্রহণ চুক্তি’ সই করতে হবে।

  • প্রচারণা: সহজ শর্তের এই ঋণ সম্পর্কে কৃষকদের জানাতে ব্যাংকের প্রতিটি শাখার ভেতরে ও বাইরে ব্যানার টাঙাতে হবে এবং চাষের মৌসুম শুরুর আগেই বিশেষ প্রচারণা চালাতে হবে।

ঋণ পরিশোধ ও আদায়ের পদ্ধতি

  • ঋণের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ড: কৃষক পর্যায়ে খাত বিবেচনায় সর্বোচ্চ তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়) ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১৮ মাস

  • আদায়ের দায় ব্যাংকের: কৃষকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট বিতরণকারী ব্যাংকের। কৃষকেরা টাকা ফেরত দিলেন কি না, তার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা মেলানো যাবে না। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে টাকা নেবে, তা ১৮ মাসের মধ্যে সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের বিস্তৃত গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়াতে এ উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখবে।

0 comments on “কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ স্কিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ