Thursday, 15 October, 2026

শীতে আলুর মড়ক বা নাবি ধসা রোগ: ফসল রক্ষায় কৃষকের করণীয়


আলুর মড়ক বা নাবি ধসা (Late Blight) রোগের চিত্র

শীতের মৌসুমে আলুর ফলন নিয়ে যখন কৃষক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, ঠিক তখনই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ‘নাবি ধসা’ বা ‘লেট ব্লাইট’ রোগ, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘আলুর মড়ক’ নামে পরিচিত। ঘন কুয়াশা, মেঘলা আকাশ এবং নিম্ন তাপমাত্রা এই রোগের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে মাত্র কয়েক দিনেই পুরো মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে শীতকালে আলুর অন্যতম প্রধান শত্রু হলো ছত্রাকজনিত মড়ক রোগ। বিশেষ করে যদি কয়েক দিন টানা কুয়াশা থাকে এবং সূর্যের আলো কম পাওয়া যায়, তবে এই রোগের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নেয়।

১. মড়ক বা নাবি ধসা রোগ চেনার উপায়

আরো পড়ুন
কৃষিকে লাভজনক করতে গবেষণা ও কোল্ড স্টোরেজে জোর দেওয়ার আহ্বান: রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত

কৃষি খাতে যেসব জায়গায় ঘাটতি রয়েছে, তা গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক করতে সরকারি সহায়তা ও Read more

রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি টাকার সার কিনছে সরকার
রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি টাকার সার কিনছে সরকার

রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি ৪৭ লাখ ১৪ হাজার ৮৫০ টাকার পটাশিয়াম (এমওপি) ও ডিএপি সার কেনার Read more

  • গাছের নিচের দিকের পাতায় প্রথমে ছোট ছোট ভেজা দাগ দেখা যায়।

  • দ্রুতই এই দাগ বড় হয়ে কালচে বা বাদামি রঙ ধারণ করে এবং পাতা পচতে শুরু করে।

  • ভোরবেলা আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক দেখা যেতে পারে।

  • আক্রান্ত ক্ষেতে এক ধরনের বিশেষ পচা গন্ধ পাওয়া যায়।

২. প্রতিকারে কৃষকের করণীয় (জরুরি পদক্ষেপ)

রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই দেরি না করে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:

  • সেচ বন্ধ রাখা: ক্ষেতে এই রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ সেচ দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। মাটিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা রোগ ছড়াতে সাহায্য করে।

  • আক্রান্ত গাছ অপসারণ: রোগের প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত গাছ তুলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

  • ছত্রাকনাশক প্রয়োগ (প্রতিরোধমূলক): কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় রোগ দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধ হিসেবে ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন: ডাইথেন এম-৪৫ বা ইন্দোফিল এম-৪৫) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে।

৩. রোগ ছড়িয়ে পড়লে করণীয় (আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা)

যদি রোগ জমিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সাধারণ ছত্রাকনাশকে কাজ হবে না। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত সংমিশ্রণ ব্যবহার করতে হবে:

ছত্রাকনাশকের গ্রুপউদাহরণ (ব্র্যান্ড নাম)প্রয়োগ মাত্রা
মেটালাক্সিল + ম্যানকোজেবরিডোমিল গোল্ড / মেটাটপ২ গ্রাম / লিটার পানি
ফেনামিডোন + ম্যানকোজেবসেকিউর১ গ্রাম / লিটার পানি
সিমোক্সানিল + ম্যানকোজেবমেলোডি ডুও / কার্জেট২ গ্রাম / লিটার পানি

স্প্রে করার নিয়ম:

  • পাতার উপরে এবং নিচে ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

  • শিশির ভেজা পাতায় ছত্রাকনাশক স্প্রে করবেন না। দুপুরের দিকে যখন রোদ উঠবে এবং পাতা শুকনা থাকবে, তখন স্প্রে করা সবচেয়ে কার্যকর।

  • রোগের প্রকোপ বেশি হলে ৩-৫ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

৪. বিশেষ সতর্কতা

  • আক্রান্ত জমি থেকে কোনোভাবেই বীজ সংগ্রহ করা যাবে না।

  • কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।

  • নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিস বা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন।

সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই পারে আপনার কষ্টের ফসল রক্ষা করতে। মনে রাখবেন, নাবি ধসা রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধই হলো প্রতিকারের চেয়ে উত্তম।

0 comments on “শীতে আলুর মড়ক বা নাবি ধসা রোগ: ফসল রক্ষায় কৃষকের করণীয়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ