মৌলভীবাজার জেলার মৎস্যচাষীদের উন্নত ও গুণগত মানের মাছের পোনা সরবরাহের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত সরকারি ‘মৌলভীবাজার মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার’ চরম জনবল সংকট এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতার কারণে অচল হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারি এই খামারটির রেনু ও পোনা উৎপাদন কার্যক্রম।
১৯৬২ সালে মৌলভীবাজার শহরের উপকণ্ঠে ৩.৭ একর জমির ওপর নির্মিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি খামারটি। খামারে ডিম সংগ্রাহক ব্রূড (প্রজননক্ষম) মাছের জন্য নির্দিষ্ট ৩টি পুকুরসহ মোট ৯টি পুকুর রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৬ দশকেরও বেশি সময়ে এখানে বড় ধরনের কোনো সংস্কার বা আধুনিকায়ন করা হয়নি।
পলিতে ভরাট পুকুর, ধসে পড়া হ্যাচারি
নিয়ম অনুযায়ী মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের পুকুরগুলোর গভীরতা ৬ থেকে ৮ ফুট থাকার কথা থাকলেও, বছরের পর বছর পলি জমে গভীরতা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ থেকে ৫ ফুটে। একই সাথে অযত্নে পুকুরের অনেক পাড় ধসে সংকীর্ণ হয়ে গেছে।
খামারটির হ্যাচারি শেড ও ভবনগুলোর অবস্থাও করুণ। দুটি ভবনেরই জরাজীর্ণ টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পড়ে প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না পাওয়ায় বছরের পর বছর ধরে প্রাচীন পদ্ধতিতেই ধুঁকে ধুঁকে চলছে এর কার্যক্রম।
৫টির মধ্যে ৩টি পদই খালি, প্রজনন মৌসুমে হাহাকার
খামারটিতে অনুমোদনপ্রাপ্ত মোট ৫টি পদের মধ্যে ৩টি পদই বছরের পর বছর ধরে খালি পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ২০২২ সাল থেকে খামার ব্যবস্থাপকের (Farm Manager) গুরুত্বপূর্ণ পদটি পুরোপুরি শূন্য।
বর্তমানে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জয় বনিক নিজের মূল দায়িত্বের পাশাপাশি কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার খামারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মাছের মূল প্রজনন মৌসুম (Breeding Season), যখন ডিম, রেনু ও পোনার ২৪ ঘণ্টা নিবিড় তদারকি প্রয়োজন হয়, তখন চরম বিপাকে পড়তে হয় প্রশাসনকে।
শ্রীমঙ্গল জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জয় বনিক বলেন:
“অন্যান্য একাধিক উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে একটি উৎপাদনমুখী খামারের ২৪ ঘণ্টা নিবিড় তদারকি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত জনবল এবং সময়মতো অবকাঠামোগত সংস্কার না থাকায় মানসম্পন্ন ব্রূড মাছ ও রেণু-পোনা উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
এক নজরে মৌলভীবাজার সরকারি মৎস্য খামারের চিত্র:
| বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| প্রতিষ্ঠাকাল ও আয়তন | ১৯৬২ সাল, ৩.৭ একর (পুকুর সংখ্যা ৯টি)। |
| জনবল অবস্থা | ৫টি পদের ৩টিই শূন্য (২০২২ থেকে ম্যানেজার নেই)। |
| পুকুরের বর্তমান গভীরতা | ৪ থেকে ৫ ফুট (প্রয়োজন ৬ থেকে ৮ ফুট)। |
| বাৎসরিক রেণু পোনার চাহিদা | ৩ থেকে ৪ কোটি পোনা, ৬,০০০-৭,০০০ কেজি রেনু। |
| সরকারি খামারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা | মাত্র ৯২৬ কেজি পোনা ও ২১৩ কেজি রেনু। |
হ্রাসের মুখে প্রাকৃতিক উৎস, বেসরকারি নির্ভরতায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা
একসময় মৌলভীবাজারের হাওর, নদী ও উন্মুক্ত জলাশয় থেকে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক মাছের পোনা পাওয়া যেত। তবে শিল্পায়ন, কৃষিজমির সম্প্রসারণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক উনমুক্ত জলাশয় সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে মৌলভীবাজারের প্রায় ২৬,০০০ পুকুর এবং ১,০০০ বাণিজ্যিক মৎস্য খামারের মালিকেরা হ্যাচারির রেনু-পোনার ওপর শতভাগ নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমানে জেলায় বছরে ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন (৩ থেকে ৪ কোটি) পোনা এবং ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ কেজি রেনুর বিশাল চাহিদা রয়েছে। অথচ সরকারি এই খামারটির বাৎসরিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৯২৬ কেজি পোনা ও ২১৩ কেজি রেনু!
চাঁদনীঘাট এলাকার স্থানীয় মৎস্যচাষী সাদেক মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সরকারি খামার থেকে যদি আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে ও ভেজালমুক্ত মানসম্পন্ন পোনা পেতাম, তবে বেসরকারি হ্যাচারির প্রতারণা ও চড়া দাম থেকে রক্ষা পেতাম।”
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মৌলভীবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন জানান, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকারি এই খামারটিকে সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অবিলম্বে একজন পূর্ণকালীন খামার ব্যবস্থাপক নিয়োগ এবং অতিরিক্ত কর্মচারী পদায়ন না করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
তবে শ্রীমঙ্গল জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জয় বনিক আশার কথা শুনিয়ে জানান, সরকারি মৎস্য খামার ব্যবস্থাপনা প্রজেক্টের আওতায় খুব শিগগিরই এই খামারের পুকুর পুনঃখনন ও হ্যাচারি ভবনগুলো আধুনিকায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার

