
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে চিবিয়ে ও রস করে খাওয়ার বিশেষ ‘চিউন’ জাতের আখের আশানুরূপ ফলন হয়েছে। বাজারে বর্তমানে এই আখের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিনের প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে তৃষ্ণা মেটাতে ও একটু প্রশান্তি পেতে সাধারণ মানুষের পছন্দের শীর্ষে ঠাঁই করে নিয়েছে আখের রস। আর এই তীব্র গরমই যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে স্থানীয় চাষিদের জন্য। বাম্পার ফলন এবং প্রত্যাশার চেয়েও ভালো বাজারমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি।
গোবিন্দগঞ্জের উর্বর মাটিতে এবার আখের যেমন রেকর্ড ফলন হয়েছে, তেমনি আখের গড়ন ও মিষ্টতা— দুটোই চমৎকার হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে খেত থেকে আখ কাটা হচ্ছে। মহাসড়কের পাশে বা জমির ধারে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাটা আখ। সেখান থেকে মিনিট্রাক, ভ্যান ও নসিমনে করে তা চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
২১৫ হেক্টর জমিতে আধুনিক জাতের আখ চাষ
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এই উপজেলার পৌরসভাসহ কামারদহ, মহিমাগঞ্জ, সাপমারা, দরবস্ত, কোচাশহর ও ফুলবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ২১৫ হেক্টর জমিতে চিবিয়ে ও রস করে খাওয়ার বিশেষ ‘চিউন’ জাতের আখ চাষ হয়েছে।
ফলন বাড়াতে কৃষকেরা এবার বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) ও কৃষি বিভাগের অনুমোদিত উচ্চ ফলনশীল ইশ্বরদী-১৬, ইশ্বরদী-৩৭, বারী-১, বারী-৪২ এবং বারী-১৭ জাতের আখের আবাদ করেছেন।
২৫ হাজার টাকা খরচে সোয়া লাখ টাকার আখ বিক্রি!
আখ চাষে অল্প পুঁজিতে বিপুল লাভের দেখা পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বকশি চর গ্রামের সফল আখ চাষি জায়েদ আলী তাঁর আনন্দের কথা জানিয়ে বলেন:
“আমি এবার মাত্র এক বিঘা জমিতে আখের চাষ করেছি। এতে বীজ, সার ও পরিচর্যা মিলিয়ে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল। পুরো জমির আখ আমি ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি! গ্রীষ্মের এই তীব্র গরম আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। গতবার যে আখ ১০-১২ টাকায় বিক্রি করতে কষ্ট হতো, এবার তা ১২-১৫ টাকায় অনায়াসে পাইকাররা খেত থেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছে।”
খেত থেকেই আখ কিনছেন দূর-দূরান্তের পাইকাররা
গোবিন্দগঞ্জের আখের গুণগত মান ও মিষ্টি বেশি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা ছুটে আসছেন। বগুড়া থেকে মহিমাগঞ্জ এলাকায় আখ কিনতে আসা বেপারি মেহেদুল ইসলাম জানান, তিনি ৫০টি আখের ১০ আটি চিকন আখ কিনেছেন প্রতি আটি ৪০০ টাকা দরে। এছাড়া মোটা, পুষ্ট ও লম্বা আখ প্রতিটি ১২ টাকা পিস হিসেবে এক হাজার পিস কিনে মিনিট্রাক ভাড়া করে বগুড়ায় নিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, খুচরা বিক্রির পাশাপাশি অনেক ব্যবসায়ী আবার জমি দেখেই বিঘাপ্রতি চুক্তি বা এককালীন মূল্যে পুরো খেতের আখ অগ্রিম ক্রয় করে নিচ্ছেন। এতে কৃষকদের পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না।
এক নজরে গোবিন্দগঞ্জের ‘চিউন’ আখ চাষ:
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত তথ্য |
| আখের ধরন | চিবিয়ে ও রস করে খাওয়ার বিশেষ ‘চিউন’ জাত। |
| জনপ্রিয় জাতসমূহ | ইশ্বরদী-১৬, ৩৭ এবং বারী-১, ৪২, ১৭। |
| মোট চাষের জমি | ২১৫ হেক্টর। |
| বিঘাপ্রতি গড় লাভ | খরচের তুলনায় ৪ থেকে ৫ গুণ (৮০,০০০ – ১,০০,০০০ টাকা)। |
মাটি আখ চাষের জন্য দারুণ উপযোগী
এই বাণিজ্যিক সাফল্যের বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মেহেদী হাসান বলেন:
“গোবিন্দগঞ্জের বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের মাটি এই বিশেষ ‘চিউন’ জাতের আখ চাষের জন্য প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শে এবার আবাদের মান খুব ভালো হয়েছে। ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় কম পরিশ্রমে কৃষকরা এই আখ চাষ করে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন। ফলে প্রতি বছরই এখানে চিবিয়ে খাওয়া আখের চাষ বাড়ছে।”
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, চিনি কলের জন্য উৎপাদিত আখের চেয়ে চিবিয়ে খাওয়ার আখের বাজারমূল্য ও নগদ টাকার সুবিধা বেশি হওয়ায় এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারি সহায়তা ও সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে এই অঞ্চলের আখ চাষে আরও বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

