
সহজ লালন-পালন ও দ্রুত প্রজনন ক্ষমতার কারণে আমাদের দেশে খরগোশ পালন দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সঠিক পরিচর্যার অভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে খরগোশ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বাণিজ্যিক বা শখের বশে খরগোশ পালন—উভয় ক্ষেত্রেই সুস্থ খরগোশ নিশ্চিত করতে রোগবালাই সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি।
নিচে খরগোশের প্রধান প্রধান রোগ, সেগুলোর লক্ষণ এবং প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. খরগোশের মাইটস রোগ ও চর্মরোগ
মাইটস (Mites) হলো ক্ষুদ্র পরজীবী, যা খরগোশের ত্বকে সংক্রমণ ঘটায়। এটি খরগোশের অন্যতম মারাত্মক ও ছোঁয়াচে সমস্যা।
লক্ষণ:
শরীরের লোম ঝরে যাওয়া ও চামড়ায় খসখসে ভাব আসা।
চামড়ায় ঘা, চুলকানি ও লালচে দাগ হওয়া।
অতিরিক্ত কান চুলকানো ও মাথা ঝাঁকানো।
চিকিৎসা ও প্রতিকার:
রোগাক্রান্ত খরগোশকে দ্রুত আলাদা করে ফেলতে হবে।
পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ইনজেকশন বা ড্রপ ব্যবহার করতে হবে।
থাকার খাঁচা বা ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক রাখতে হবে।
২. খরগোশের কানের রোগ
কানের মাইটস বা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে খরগোশের কানের ভেতর প্রদাহ বা ঘা তৈরি হতে পারে।
লক্ষণ:
কানের ভেতরে শক্ত মামড়ি বা আবরণ পড়া।
অনবরত কান চুলকানো এবং মাথা একপাশে কাত করে রাখা।
কানের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়া।
চিকিৎসা ও প্রতিকার:
হালকা কুসুম গরম পানি ও তুলা দিয়ে সাবধানে কানের বাইরের অংশ পরিষ্কার করতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শে ইয়ার ড্রপ বা অ্যান্টি-মাইট ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে।
৩. খরগোশের চোখের রোগ
ধুলোবালি, খাঁচার ময়লা অথবা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণে খরগোশ চোখের রোগে ভুগতে পারে।
লক্ষণ:
চোখ দিয়ে অনবরত পানি বা পুঁজ পড়া।
চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা ফুলে যাওয়া।
চোখ পিছুটি দিয়ে আটকে থাকা।
চিকিৎসা ও প্রতিকার:
পরিষ্কার তুলা ও স্যালাইন পানি দিয়ে চোখ নিয়মিত পরিষ্কার করে দিতে হবে।
পশুবৈদ্যের নির্দেশ অনুযায়ী চোখের অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করতে হবে।
৪. হজমজনিত সমস্যা ও ডায়েরিয়া
খারাপ খাবার, হঠাৎ খাদ্য পরিবর্তন বা অপরিষ্কার পানির কারণে খরগোশের পেটের সমস্যা দেখা দেয়।
লক্ষণ:
পাতলা পায়খানা বা শক্ত বিষ্ঠা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
খাবার খাওয়া একদম বন্ধ করে দেওয়া।
পেটে গ্যাস জমে পেট ফুলে থাকা।
চিকিৎসা ও প্রতিকার:
দ্রুত খাবার পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হবে।
খরগোশকে তাজা ও পরিষ্কার সবুজ ঘাস এবং বিশুদ্ধ পানি দিতে হবে।
পাতলা পায়খানা হলে দ্রুত স্যালাইন ও পশু চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ দিতে হবে।
খরগোশকে রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষার উপায়
১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: খাঁচা এবং খাবার পাত্র প্রতিদিন পরিষ্কার রাখতে হবে। ভিজা বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় খরগোশ রাখা যাবে না।
২. সঠিক পুষ্টিকর খাবার: আঁশযুক্ত খাবার যেমন—সবুজ ঘাস, শুকনা খড় (Hay) খরগোশের প্রধান খাদ্য হওয়া উচিত। পচা বা বাসি খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৩. আলাদা রাখা (Quarantine): নতুন খরগোশ খামারে আনার পর অন্তত ১০-১৫ দিন আলাদা রেখে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৪. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: খরগোশের খাবার গ্রহণের পরিমাণ, চলাফেলা ও লোমের অবস্থা প্রতিদিন ভালো করে খেয়াল করুন।
খরগোশ বেশ সংবেদনশীল প্রাণী। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা মাত্রই অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জন বা পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও যত্ন নিশ্চিত করতে পারলে খরগোশকে যেকোনো বড় ধরনের রোগবালাই থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

