বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ। বৈশ্বিক ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭৫ শতাংশই আসে বাংলাদেশ থেকে, আর বাকি ২৫ শতাংশের যোগান দেয় ভারত ও মিয়ানমার। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ এবং জিডিপিতে ১ শতাংশ অবদান রাখে এই একটি মাত্র প্রজাতি। দেশের সরাসরি প্রায় ১০ লাখ জেলে এবং পরোক্ষভাবে আরও ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এই ইলিশের ওপর।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে ইলিশের আহরণ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫.৭১ লাখ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫.০০ লাখ টনে—অর্থাৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। শুধু মৎস্য অধিদপ্তরের প্রথাগত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যে এই সংকট দূর করা যাচ্ছে না, গবেষণায় তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
বদলে যাচ্ছে ইলিশের গতিপথ: ভারতের Hooghly থেকে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা
ইলিশ মূলত একটি ‘অ্যানাড্রোমাস’ (Anadromous) প্রজাতির মাছ—অর্থাৎ এরা বেশিরভাগ সময় বঙ্গোপসাগরে কাটালেও প্রজনন মৌসুমে (বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে) ডিম ছাড়ার জন্য ঝাঁক বেঁধে পদ্মা ও মেঘনার মতো প্রদ্বীপে চলে আসে। অতীতে ইলিশ প্রজননের জন্য দেশের ভেতরে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতো। তবে সম্প্রতি গবেষণায় উঠে এসেছে তিনটি বড় ধরনের পরিবর্তনের চিত্র:
ভারতের দিকে মোড় (পশ্চিমমুখী বিচ্যুতি): তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পদ্মার উজান অংশে মাছের পরিমাণ কমলেও পশ্চিমবঙ্গের হুগলী নদীতে ইলিশের বিচরণ বেড়েছে। লবণাক্ততা ও নদীর স্রোত পরিবর্তনের কারণে ইলিশ ভারতের জলসীমার দিকে ঘুরে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের উপকূলে উপস্থিতি (পূর্বমুখী বিচ্যুতি): মিয়ানমারের আইয়াকিয়াওয়াদি (Ayeyarwady) উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরের পূর্ব দিকে এদের নতুন রুটের ইঙ্গিত দেয়।
গভীর সমুদ্রে প্রজনন সম্পন্ন করা: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (BAU) গবেষণায় দেখা গেছে, নদীতে ঢোকার মুখে প্রতিকূল পরিবেশ দেখলে বড় ইলিশগুলো আর নদীর গভীরে না এসে সমুদ্রের মোহনাতেই জীবনচক্র শেষ করছে।
ইলিশের রুট পরিবর্তনের ৪টি প্রধান কারণ
নদীতে ইলিশ না আসার পেছনে মূল উপাদান হিসেবে কাজ করছে বেশ কিছু পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা:
নদীতে পলি পড়া ও নাব্যতার সংকট: ইলিশের প্রজনন যাত্রার জন্য অন্তত ১০ মিটার গভীরতা এবং প্রবল স্রোত প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবছর নদীতে বিপুল পরিমাণ পলি জমার কারণে নদীগুলোর গভীরতা কমে ৫-৬ মিটারে নেমে এসেছে। ডুবোচর ইলিশের চলাচলে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রজনন সংকেত বিঘ্নিত হওয়া: গত ৩০ বছরে বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে নদীর স্বাদু পানির রাসায়নিক সংকেত বদলে যাচ্ছে, যা ইলিশকে নদীর দিকে আসতে বাধা দেয়।
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পবর্জ্যের থার্মাল বাধা: পটুয়াখালী, বরগুনা ও বরিশালের নদী বা উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে গরম পানি নদীতে ফেলায় পানির তাপমাত্রা ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। সংবেদনশীল ইলিশ এই অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মুখ ফিরিয়ে সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছে।
মোহনায় কারেন্ট জাল ও অতি-আহরণ: তেঁতুলিয়া নদীসহ গুরুত্বপূর্ণ মোহনাগুলোতে কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের ফাঁদ পেতে প্রজননক্ষম মা ইলিশ এবং ছোট জাটকা নির্বিচারে শিকার করা হচ্ছে।
ইলিশের বর্তমান অভয়াশ্রম ও প্রজনন ক্ষেত্রসমূহ
মাছ রক্ষায় দেশে বর্তমানে ৬টি নিবন্ধিত অভয়াশ্রম এবং ৪টি সামুদ্রিক প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিত রয়েছে:
দেশের ৬টি ইলিশ অভয়াশ্রম:
অভয়াশ্রম ১: চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিমি এলাকা।
অভয়াশ্রম ২: ভোলার শাহবাজপুর নদীর ৯০ কিমি এলাকা।
অভয়াশ্রম ৩: ভোলার বেদুরিয়া থেকে চর রুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিমি এলাকা।
অভয়াশ্রম ৪: পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিমি এলাকা।
অভয়াশ্রম ৫: শরীয়তপুর/চাঁদপুরের নড়িয়া থেকে তারাবুনিয়া পর্যন্ত পদ্মা নদীর ২০ কিমি এলাকা।
অভয়াশ্রম ৬: বরিশাল-মেঘনা শাখার হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের প্রজনন চ্যানেলসমূহ।
৪টি সামুদ্রিক প্রজনন ক্ষেত্র:
ঢালের চর (চর ফ্যাশন, ভোলা)
মনপুরা দ্বীপ (ভোলা)
মৌলভীর চর (হাতিয়া, নোয়াখালী)
কালীর চর (সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম)
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আমাদের করণীয়
যেহেতু ইলিশ বঙ্গোপসাগরের যৌথ সম্পদ, তাই এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এটি রক্ষা করা সম্ভব নয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে মিল না থাকা (Asymmetrical Fishing Bans) ইলিশের বড় ক্ষতি করছে। বাংলাদেশে যখন ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকে, তখন অন্য দেশের জেলেরা সেই মাছ ধরে নিয়ে যায়।
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ৫ দফা সুপারিশ:
ক্যাপিটাল ড্রেজিং চালু করা: মেঘনার নিচের অংশ, হাতিয়া ও ভোলা চ্যানেলে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে নাব্য অন্তত ১০ মিটারে উন্নীত করতে হবে।
আঞ্চলিক চুক্তি ও যৌথ নিষেধাজ্ঞা: ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা একই সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
কঠোর শিল্প নীতিমালা: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কারখানার বর্জ্য এবং গরম পানি যাতে নদীর তাপমাত্রা বাড়াতে না পারে, সে জন্য পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি: ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা নিধন বন্ধের সময় জেলেদের ভিজিএফ (VGF) চাল সময়মতো পৌঁছে দিতে হবে এবং দাদন প্রথা বন্ধে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আধুনিক গবেষণা ও ট্র্যাকিং: BFRI এবং আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও অ্যাকোস্টিক ট্যাগের মাধ্যমে ইলিশের পরিবর্তিত পরিযায়ন পথ প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সঠিক উদ্যোগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল হারিয়ে যাওয়া রূপালী ইলিশের অতীত ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

