
চাকরি ছেড়ে হাঁসের খামার গড়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া মারণ রোগে সব হাঁস মারা যাওয়ায় চোখের সামনে শেষ হয়ে যায় জীবনের সম্বল ও বিনিয়োগকৃত টাকা। লোকসানের বড় ধাক্কায় যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই ইউটিউবের একটি ভিডিও বদলে দেয় তার জীবন ও চিন্তাধারা। পরিচিত হন ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’ বা কালো পোকা চাষের অভিনব ধারণার সঙ্গে।
শুরুতে পরিবারের অবহেলা আর মানুষের হাসাহাসি সহ্য করতে হলেও দমে যাননি তিনি। ছোট পরিসরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে আজ তিনি গড়ে তুলেছেন পাঁচটি বিশাল খামার। ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই চাষ করে মাসে আয় করছেন দুই লক্ষাধিক টাকা, সেই সঙ্গে ১৭ জন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। অনুপ্রেরণাদায়ী এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার পারসিধাই গ্রামের উদ্যোক্তা শিমুল হোসেনের।
বিফলতা থেকে ইউটিউবে মেলেন সমাধান
পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা পাস করার পর ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন মোজাহার আলী প্রামানিকের ছেলে শিমুল হোসেন। ৬ বছর আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে স্বপ্নের হাঁসের খামার করেন। কিন্তু রোগে আক্রান্ত হয়ে সব হাঁস মারা গেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।
লোকসান কাটিয়ে নতুন কিছু করার তাগিদে অনলাইনে বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক ভিডিও দেখা শুরু করেন শিমুল। সেখানেই প্রথমবারের মতো ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’ (BSF) বা বিশেষ প্রজাতির কালো পোকা চাষ সম্পর্কে জানতে পারেন।
বর্জ্য থেকে প্রোটিন: কম খরচে লাভজনক প্রযুক্তি
ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের লার্ভা মূলত হাঁস-মুরগি ও মাছের খাদ্যে উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পোল্ট্রি ও ফিড ইন্ডাস্ট্রিতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। খাবারের উচ্ছিষ্ট ও বিভিন্ন জৈব বর্জ্য খেয়েই এই লার্ভা দ্রুত বেড়ে ওঠে। পরিবেশ রক্ষা ও প্রাণিখাদ্যের খরচ কমানোর জোড়া সুযোগ দেখে ঝুঁকি নিয়ে পোকা চাষে নেমে পড়েন শিমুল।
শুরুতে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক নিয়মে লার্ভা সংগ্রহ করতে অনেক বাধা উৎরাতে হয়েছে। তবে বর্তমানে শিমুলের পাঁচটি খামারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিপুল পরিমাণ লার্ভা উৎপাদিত হচ্ছে। লার্ভাগুলো সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে বিভিন্ন ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়, যা চাহিদার কারণে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
‘বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল পরিবার, আজ তারাই গর্বিত’
সাফল্যের পেছনের কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে শিমুল হোসেন বলেন, “হাঁসের খামার হারিয়ে যখন দিশেহারা, তখন ইউটিউব আমাকে নতুন পথ দেখায়। শুরুতে ঘরোয়া পরিবেশে ছোট করে শুরু করেছিলাম। মানুষ হাসাহাসি করত, পরিবারও মেনে নেয়নি। একপর্যায়ে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরও করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। এখন আমার ৫টি খামার থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি আয় হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আনন্দ, আমার এখানে ১৭ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।”
শিমুলের বাবা মোজাহার আলী প্রামানিক আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “প্রথমে পোকা চাষের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। ভাবতাম এটা কোনো কাজ হলো! তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করেছি। কিন্তু আজ তার বড় খামার হয়েছে, সেখানে অনেক মানুষ দিনরাত কাজ করছে। নিজের ছেলের অধীনে অন্যদের কাজ করতে দেখে এখন খুব গর্ব হয়।”
নতুন সম্ভাবনার কথা বলছেন কর্মকর্তারা
শিমুলের উদ্যোগে বেকার যুবকদের আয়ের পথ খোলায় উচ্ছ্বসিত স্থানীয় বাসিন্দারাও। তারা জানান, সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ মিললে এ অঞ্চলে আরও উদ্যোক্তা তৈরি সম্ভব।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. জহুরুল ইসলাম জানান, “ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের লার্ভা প্রাণিখাদ্যে প্রোটিনের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং আধুনিক উৎস। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারে এটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে শিমুলের মতো সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের সব ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “দেশের প্রাণিখাদ্যে প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে ও বেকারত্ব দূর করতে এ ধরনের উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা অত্যন্ত প্রয়োজন। নতুনদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তরুণদের এই ধরনের উদ্যোগে উৎসাহিত করা উচিত।”

