
দেশের নদীভাঙন, পাহাড়ি ভূমিধস এবং সড়ক-বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল রক্ষায় সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ‘বিন্না ঘাস’ (Vetiver Grass) ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট এক উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটিতে ৮ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ১৬ জন সচিব স্থান পেয়েছেন।
পরিকল্পনা বিভাগ থেকে গত ৫ সেপ্টেম্বর জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ কমিটি গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর-কে প্রধান করে গঠিত এই কমিটি উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন অবকাঠামোর ঢাল (slope) সুসংহত ও টেকসই রাখতে বিন্না ঘাসের ব্যবহার কতটা কার্যকর এবং সাশ্রয়ী তা গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।
যেসব বিষয়ের সম্ভাব্যতা যাচাই করবে কমিটি
পরিকল্পনা কমিশনের অধীনে কাজ শুরু করা এই টেকনিক্যাল কমিটি প্রধানত নিচের ক্ষেত্রগুলোতে সমীক্ষা পরিচালনা করবে:
ব্যয় নির্ধারণ: সড়ক, মহাসড়ক, নদীর তীর, খাল-বিল, হাওর এবং বেড়িবাঁধের দুই পাশে প্রতি কিলোমিটার বিন্না ঘাস রোপণের আনুমানিক খরচ ও কারিগরি দিক নির্ধারণ।
স্থান নিরূপণ: বিভিন্ন সড়ক ও বাঁধের পাশে বিন্না ঘাস রোপণের জন্য নির্দিষ্ট কী পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন তা যাচাই।
পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি সড়কের ঢাল, হ্রদের পাড় এবং পাহাড়ের পাদদেশে ভূমিধস রোধে এই ঘাস রোপণের কার্যকারিতা নিরূপণ।
জাতীয় কমিটির সদস্য ও কারিগরি কাঠামো
কমিটিতে সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ প্রতিনিধিরা যুক্ত হয়েছেন। পরিকল্পনা কমিশন, পানি সম্পদ, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, সড়ক পরিবহন ও সেতু, কৃষি এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধিরা এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
এছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), গণপূর্ত অধিদপ্তর, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরাও এই কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম অন্যতম বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে কমিটিতে রয়েছেন। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এই টেকনিক্যাল কমিটির ‘সদস্য-সচিব’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রয়োজনে কমিটি আরও নতুন বিশেষজ্ঞ সদস্য কো-অপ্ট (অন্তর্ভুক্ত) করতে পারবে।
এক নজরে বিন্না ঘাস ও সরকারি কার্যক্রম:
| বিষয় | বিবরণ ও পরিসংখ্যান |
| গঠিত কমিটি | ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটি (৮ প্রতিমন্ত্রী ও ১৬ সচিবসহ)। |
| কমিটির প্রধান | রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর (অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা)। |
| বিন্না ঘাসের বৈশ্বিক ব্যবহার | বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে মাটি সুসংহতকরণে ব্যবহৃত। |
| মূল বৈশিষ্ট্য | মাটির গভীরে শেকড় প্রবেশ করে ভাঙন ও ধস প্রতিরোধ করে। |
বিন্না ঘাস কী এবং কেন এটি কার্যকর?
বিন্না বা ভেটিভার (Vetiver) ঘাস এক ধরনের বহুবর্ষজীবী সুগন্ধি ঘাস, যা বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর জন্মায়। ১৯৮০-র দশকে বিশ্বব্যাংক মাটি ও পানি সংরক্ষণের জন্য ‘ভেটিভার সিস্টেম’ (Vetiver System) প্রবর্তন করে। বর্তমানে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে মাটি সুসংহত করতে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট ‘বাংলাদেশের জন্য ভেটিভার গ্রাস পলিসি’ শীর্ষক এক বৈঠকে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানান, বিন্না ঘাসের শেকড় মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করে শক্তভাবে আটকে রাখে। এটি বৃষ্টিপাত, নদীর ঢেউ ও স্রোতের কারণে হওয়া মাটির ক্ষয় কমায়। নদী-খালের পাড়, বেড়িবাঁধ, পাহাড়ি ঢাল ও হাওর এলাকায় বিন্না ঘাসের রোপণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামোর স্থায়ীত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

