
আগামী আমন মৌসুমকে সামনে রেখে দেশে ইউরিয়া সারের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সরকারি গুদামে সারের মজুদ ৪ লাখ টনের বেঞ্চমার্কের নিচে নেমে ৩.৫৪ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় আমদানিকারকদের অনীহার কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন আমন মৌসুমে দেশে আনুমানিক ৬.৬৫ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বর্তমান মজুদ মিলিয়ে জুন শেষে সারের প্রাপ্যতা দাঁড়াতে পারে ৫.৫ লাখ টনে। ফলে মৌসুম শুরুর ঠিক আগেই প্রায় ১ লাখ টন সারের ঘাটতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমদানিতে বাধা: হরমুজ প্রণালী ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের আমদানিকৃত সারের একটি বড় অংশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এই পথ দিয়েই আসে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (BCIC) কর্মকর্তারা জানান:
সারের জন্য দেওয়া আন্তর্জাতিক দরপত্রে সরবরাহকারীরা সাড়া দিচ্ছে না।
গত ২৫ মার্চ ও ১ এপ্রিল ৪ লাখ টন সারের জন্য দুটি দরপত্র আহ্বান করা হলেও একটিতে কোনো আবেদন পড়েনি, অন্যটিতে মাত্র ৫০ হাজার টনের আংশিক প্রস্তাব মিলেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ২৭ এপ্রিল ২ লাখ টনের জন্য পুনরায় দরপত্র (Re-tender) দেওয়া হয়েছে।
দেশীয় উৎপাদন ও বর্তমান অবস্থা
গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ থাকার পর গত ১ মে থেকে কাফকো (Kafco) এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি (SFCL) পূর্ণ উৎপাদনে ফিরেছে। বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান বলেন:
“অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বর্তমান মজুদ মিলিয়ে জুন শেষে ৫.৫ লাখ টন সার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে আমন মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও বাড়তি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।”
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও বিকল্প উৎসের সন্ধান
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, প্রথাগত পদ্ধতিতে সার আমদানির চিন্তা করলে এবার কাজ হবে না। তিনি বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সার আমদানিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাতে সময় খুব কম।”
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভর না করে সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা জরুরি। বিসিআইসি এখন বিকল্প উৎস হিসেবে নিম্নোক্ত দেশগুলোর কথা বিবেচনা করছে:
মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও ভিয়েতনাম।
রাশিয়া, মিসর ও আজারবাইজান।
এক নজরে ইউরিয়া সারের পরিস্থিতি:
| বিষয়ের নাম | পরিসংখ্যান/তথ্য |
| বার্ষিক চাহিদা | ২৬ লাখ টনের বেশি। |
| আমন মৌসুমের চাহিদা | ৬.৬৫ লাখ টন। |
| জুন শেষে সম্ভাব্য মজুদ | ৫.৫ লাখ টন। |
| সম্ভাব্য ঘাটতি | ১.১৫ লাখ টন। |
| প্রধান আমদানিকারক উৎস | সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। |
খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাবের শঙ্কা
এফএও (FAO) এর তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম ইতিমধ্যে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়মতো সার নিশ্চিত করা না গেলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা সরাসরি চালের বাজারে প্রভাব ফেলবে। বিএডিসি (BADC) সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সৌদি আরব থেকে ৮০ হাজার টন সার আসার কথা রয়েছে এবং মে মাসে মরক্কো থেকে একটি চালান পৌঁছাতে পারে।

