Sunday, 01 November, 2026

পাট রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে ‘স্লিভার’ রপ্তানির মহোৎসব


কাঁচা পাট রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে জুট স্লিভার রপ্তানি বন্ধের দাবি

ঘরোয়া শিল্পের কাঁচামাল নিশ্চিত করতে সরকার কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করলেও, সেই নিয়মের ফাঁক গলে ‘জুট স্লিভার’ (প্রাথমিক স্তরের প্রক্রিয়াজাত পাট পণ্য) রপ্তানির মেগা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এক শ্রেণির পাটকল মালিক কাঁচা পাট রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং সরকারের ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা লুটে নিতে দেদারসে স্লিভার রপ্তানি করছেন।

এই পরিস্থিতি বন্ধে জুট স্লিভার রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জরুরি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ)।

কড়াকড়ি এড়াতে মিল মালিকদের নতুন কৌশল

আরো পড়ুন
তেলাপিয়া মাছের শীতকালীন রোগ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক পরিচর্যা

বাণিজ্যিক মৎস্য চাষে তেলাপিয়া অন্যতম লাভজনক ও জনপ্রিয় মাছ। তবে শীতকালে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে পুকুরের পরিবেশ এবং মাছের Read more

স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: কম খরচে লাভজনক আনারকলি (Passion Fruit) চাষ পদ্ধতি ও যত্ন
বাংলাদেশে আনারকলি চাষ

বাংলাদেশের কৃষিতে সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রচলিত ফল ও সবজি চাষে বিপ্লব ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক নাম হলো Read more

গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাণিজ্য সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিজেএ-এর চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির জানান, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করতে এবং বাজারে পাটের ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-১ শাখা কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর বিশেষ শর্ত ও কড়াকড়ি আরোপ করে। সরকারের এই শর্ত সাপেক্ষ রপ্তানি নীতির ফলে কার্যত কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির পাটকল মালিক কাঁচা পাটকে সামান্য রূপান্তর করে ‘জুট স্লিভার’ হিসেবে বড় বড় চালানে বিদেশে পাঠাচ্ছেন। স্লিভার মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন শিল্প কাঁচামাল, যা বিদেশে নিয়ে সুতা বা অন্য পাটজাত পণ্যে রূপান্তর করা হয়। এটি কোনো উচ্চ মূল্য সংযোজিত (High Value-Added) পণ্য নয়।

প্রণোদনার নামে সরকারি তহবিলের অর্থ লোপাট

বিজেএ-এর চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, আন্তর্জাতিক কাস্টমস নিয়মে জুট স্লিভারের আলাদা কোনো ‘এইচএস কোড’ (HS Code) নেই। এমনকি সরকারি প্রণোদনার নিয়ম অনুযায়ী এটি কোনো ‘বহুমাত্রিক পাটজাত পণ্য’ (Jute Diversified Product)-এর আওতায়ও পড়ে না।

তা সত্ত্বেও, মিল মালিকেরা কাঁচা পাট রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ স্লিভার রপ্তানি করে চলেছেন এবং সরকারের ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা (Cash Incentive) পকেটে পুরছেন। মূলত এই নগদ প্রণোদনার লোভেই স্লিভার রপ্তানির এই মহোৎসব চলছে।

এক নজরে পাট খাতের বর্তমান সংকট:

সংকটের মূল বিষয়বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব
কাঁচা পাট রপ্তানি নীতিঅভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে শর্ত সাপেক্ষ ও সীমিত।
স্লিভার রপ্তানির প্রণোদনানিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা সুবিধা গ্রহণ।
কৃষকদের ওপর প্রভাবমিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত কৃষক।
যৌথ দাবিবিজেএমএ এবং বিজেএসএ যৌথভাবে ২৫ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রথম এই নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিল।

অতীতেও নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিল খোদ মিল মালিকদের সংগঠন

মজার বিষয় হলো, জুট স্লিভার রপ্তানি বন্ধের এই দাবি শুধু ব্যবসায়ীদের নয়। এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) যৌথভাবে তৎকালীন বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে স্লিভার রপ্তানি নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিল।

সংকটে সাধারণ পাট চাষিরা

বিজেএ বলছে, এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন এবং পুরো পাট খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে গুটি কয়েক মিল মালিকের হাতে। মিল মালিকেরা বাজার সিন্ডিকেট করার কারণে একদিকে যেমন সাধারণ কৃষকেরা পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকার তহবিল অপচয় হচ্ছে, যা সামগ্রিক পাট খাতকে চরম ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে স্লিভার রপ্তানি বন্ধে দ্রুত কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

0 comments on “পাট রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে ‘স্লিভার’ রপ্তানির মহোৎসব”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ